সেই সময় ঈদ আসত আনন্দের পতাকা উড়িয়ে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ষাট-সত্তরের দশকে ঢাকা শহরে হাতের শিরার মতো ছড়ানো অসংখ্য সংকীর্ণ অলিগলি বেয়ে ঈদের দিনটা আসত আনন্দের ঝলমলে পতাকা উড়িয়ে। আমাদের দলবেঁধে থাকা, আতরের উষ্ণ ঘ্রাণ মাখা আমাদের সফেদ পাঞ্জাবি-পায়জামা, জড়াজড়ি করে থাকা বাড়িগুলো থেকে ভেসে আসা পোলাও, মাংসের সুঘ্রাণ সেই বিশেষ দিনগুলোকে যেন অন্য রঙে এঁকে দিত।
যে সময়ের কথা লিখছি, তখন সেই শহরটা এত শক্তিশালী হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েনি। তার বাড়িগুলো আকাশ ছুঁয়ে ফেলার ভীষণ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেনি, দেয়ালগুলো উঁচু হয়নি, পথে ভিড় উপচে পড়েনি। সেই নিরিবিলি দিনগুলোতে উৎসবের জামা গায়ে ঈদ আসত বিশেষ আনন্দের গল্প বলতে। তখন ঢাকার নতুন এবং পুরনো অংশে ছোট ছোট অসংখ্য মেলা হতো। এখনকার ফকিরেরপুলের যে বিশাল রাস্তাটা মতিঝিলের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলে, স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে সেটা তৈরি হয়নি।
মাটির রাস্তার পাশে বিশাল লোহার কাঠামো নিয়ে বিশাল পানির ট্যাংকটা সবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। সেখানেই ঈদের সময়ে মেলা বসত। মাটির তৈরি পুতুল ঝুড়িতে সাজিয়ে বিক্রেতারা আমাদের জন্য অপেক্ষা করত। নিপুণ তুলির টানে রঙ করা হাঁস, মাথা ঝাঁকানো বুড়ো, ঘোড়া, হাতি, বাঘ, বিচিত্র পোশাকে নভোচারী, মাছ, কী থাকত না সেই মেলায়! তখনো মেলায় বিক্রি হতো মুরালী, চিনিতে মাখামাখি ছোট ছোট এক ধরনের সন্দেশ আর জিলাপি। সেই মেলায় বন্ধুরা দলবেঁধে গেলে আমাদের হাতের মুঠোয় থাকত সামান্য কয়েকটা পয়সা। কখনো ঘামে ভিজে উঠত মুঠোবন্দি পয়সাগুলো। কী কিনব, কী কিনব না ভাবতে ভাবতে রুদ্ধশ্বাস সময় বয়ে যেত। কাঠের নাগরদোলার একটানা ঘুরে চলার শব্দ আমাদের মনের মধ্যে ঈদের আনন্দকে তীব্র করে তুলত।
আরও একটু বড় হয়ে এই শহরে ঈদের দিন সার্কাস দেখাতে আসত বিভিন্ন দল। সন্ধ্যাবেলা রীতিমতো তাবুর তলায় বসে যেত জমজমাট সার্কাসের আসর। পুরান ঢাকার বাইরে ক্রমে বেড়ে ওঠা শহরের খালি জায়গায় সার্কাসের আয়োজন করা হতো। গান বাজত মাইকে। রঙিন কাটা কাগজের নিশান উড়ত। মাইকে বারবার সার্কাসে নানা ধরনের খেলার ঘোষণা দেওয়া হতো। সন্ধ্যাবেলা সেই আয়োজনগুলো নিষিদ্ধ আবরণে মোড়া থাকত আমাদের জন্য। কিন্তু সেই তীব্র আকর্ষণ বাধা মানতে মনকে অনাগ্রহী করে তুলত। সার্কাসের আলো, ছুরির খেলা, ‘মৃত্যুকূপে’ মোটরসাইকেলের দুর্ধর্ষ ঝুঁকি আমাদের ঠিক টেনে নিয়ে যেত তাঁবুর নিচে।
তখন এই শহরে রিকশায় ভ্রমণ ছিল ঈদের আনন্দের অংশ। পকেটে খুব বেশি অর্থযোগ ঘটত না। কোনো কোনো গুরুজনকে সালাম করে পাওয়া সামান্য কয়েক টাকা ব্যয় হতো রিকশা ভ্রমণে। ফাঁকা শহরে রিকশায় চড়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ানো ছিল আমাদের ঈদের বিলাসিতার বড় অংশ। অবশ্য দুপুরবেলা টাকা বাঁচিয়ে সদ্য মুক্তি পাওয়া সিনেমা দেখতে যাওয়াটাও সেই ঈদের দিনগুলোর আনন্দের স্মৃতি হয়ে আছে আজও।
আনন্দের সংজ্ঞা পাল্টে যায়। এই শহরে একদা উৎসবের মতো বয়ে যাওয়া ঈদের দিনের সময়টা এখনো মনের মধ্যে ফ্রেমে বাঁধাই হয়ে আছে। স্মৃতি বেঁচে থাকে এক ধূসর পর্দার আড়ালে। এখন এই শহরে উৎসবের, আনন্দের কাঠামোটা নিজেকে বদলে নিয়েছে। তাতে নতুন রঙ লেগেছে, নতুন সুর লেগেছে। তবু পেছনে ফেলে আসা এক শহরে ঈদের আনন্দের সুর, কত পাওয়া-না-পাওয়ার হাসি-কান্না ছায়াছবির মতো বয়ে যায় চোখের সামনে দিয়ে। ঈদ আসে আনন্দ নিয়ে। আবার দিনটা চলেও যায়। কিন্তু সেই আতরের উষ্ণ ঘ্রাণ, দলবেঁধে থাকা ফুরফুরে দিন, খাবারের সরস আয়োজন মনের মধ্যে মগ্ন হয়ে বাঁশি বাজাতেই থাকে।






