সম্পাদকীয়
পাসের ফাঁসে রেকর্ডের ভেলকি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এবারও এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের পর শুরু হয়েছে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। শিক্ষা বোর্ডের ভাষায় যাকে বলা হচ্ছে ‘খাতা চ্যালেঞ্জ’। আশানুরূপ ফল না পাওয়ার হতাশা সামাল দিতে গিয়ে এবার রেকর্ডসংখ্যক আবেদন জমা দিয়েছেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। এটি সাধারণ কোনো অ্যাকাডেমিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং রূপ নিয়েছে এক বিশাল কর্মযজ্ঞে। মাত্র সাত দিনে চার লক্ষাধিক পরীক্ষার্থী প্রায় ১৩ লাখ উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছে। একদিকে পাসের হার তলানিতে, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত ফল না মেলায় খাতা চ্যালেঞ্জের হিড়িক প্রমাণ করে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদ শুধু শ্রেণিকক্ষেই আটকে নেই; তা থাবা বসিয়েছে উত্তরপত্র মূল্যায়নেও। সার্বিক পরিস্থিতিতে আসলে শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটই প্রকাশ পাচ্ছে।
দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত কৃত্রিম নম্বরের ফোয়ারা শুকিয়ে যেতেই এবার আসল চিত্র বেরিয়ে এসেছে। ২০২৫ সালে যেখানে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫, সেখানে ২০২৬ সালে তা এক ধাক্কায় নেমে দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। গড় পাসের হার কমার পাশাপাশি জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২২ হাজারের বেশি। প্রায় ১৮ লাখ ৫৭ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৯ হাজার। বাকি ছয় লাখের বেশি পরীক্ষার্থী ফেল করেছে। এই বিপুল অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর চিত্র লাখ লাখ পরিবার ও তাদের স্বপ্নের ওপর এক বিষাদময় ধাক্কা।
এ ধাক্কা সামলাতে চার লাখের বেশি শিক্ষার্থী গড়ে তিনটি করে বিষয়ের খাতা চ্যালেঞ্জের দরখাস্ত জমা দিয়েছে। ঢাকা বোর্ডে আবেদন পড়েছে সাড়ে তিন লাখের কাছাকাছি। এমনকি জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীও গোল্ডেন জিপিএ ৫ পাওয়ার রেসে নেমেছে। সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়েছে ইংরেজি ও গণিতে। এর নেপথ্যে রয়েছে মূল্যায়নের কড়াকড়ি। কেন্দ্রে কড়া নজরদারি, পরীক্ষকদের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ আর সহানুভূতির নম্বর দেওয়া বন্ধ হতেই ফানুস ফুটো হয়ে গেছে। মুখস্থবিদ্যায় অভ্যস্ত শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন একটু ঘুরিয়ে দিলেই বিপদে পড়ছে।
এর মধ্যে আবার জল ঘোলা করেছে সরকারের হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত। আগে শুধু নম্বর গণনা বা যোগফল ঠিক আছে কি না, তা দেখা হতো। কিন্তু এবার পুরো উত্তরপত্র নতুন করে মূল্যায়নের ঘোষণা দেওয়ায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা আবেদনের বন্যা ছুটিয়েছে। অথচ শিক্ষা বোর্ডগুলো এখন এই প্রায় ১৩ লাখ খাতার পাহাড় সামলাতে দিশাহারা। শিক্ষামন্ত্রী নিজেই স্বীকার করছেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় এত খাতা নতুন করে মূল্যায়ন করা অসম্ভব।
বছরের পর বছর ঢালাওভাবে নম্বর দিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সক্ষমতাকে আড়াল করা হয়েছিল। এবার মূল্যায়নে কিছুটা শৃঙ্খলা আসতেই সত্য বেরিয়ে পড়েছে। খাতা পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ পরীক্ষার্থীর আইনি অধিকার হতে পারে। কিন্তু হঠাৎ নিয়ম বদলের সিদ্ধান্ত পুরো পদ্ধতিকে প্রহসনে পরিণত করেছে। তবে সার্বিকভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়নের ওপর শিক্ষার্থীদের আস্থা ফেরানো জরুরি।
মনে রাখা দরকার, দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারকদের নিত্যনতুন এক্সপেরিমেন্টের করুণ শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। কর্তৃপক্ষ কীসের স্বার্থে কখনো গণহারে পাস করায় আর কীসের স্বার্থেইবা হঠাৎ নম্বর দেওয়ার হাত গুটিয়ে নেয়, তা বোধগম্য নয়। পুরো ব্যবস্থার পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে এ অবিশ্বাস দূর হবে না। একই সঙ্গে, নতুন নীতিমালায় যেন খাতা পুনর্নিরীক্ষণের এ সুযোগের কোনো অপব্যবহার না হয়, সে বিষয়েও শিক্ষা বোর্ডগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।






