পাইপলাইনে বন্দি উন্নয়ন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
টাকা আছে, অথচ কাজ নেই। সিন্দুকে লক্ষ্মী অচলা আর দেশ জুড়ে প্রদীপের নিচে অন্ধকার। বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্থনীতির বর্তমান ছবিটা ঠিক এ রকমই। বৈদেশিক ঋণের প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা পাইপলাইনে জমে বসে আছে। টাকার এই পাহাড় দেখে চমকে উঠতে হয়। কিন্তু তার চেয়েও বেশি অবাক হতে হয় আমাদের মন্থরগতি দেখে। উন্নয়ন সহযোগীরা টাকা দিতে প্রস্তুত, অথচ আমরা তা খরচ করতে পারছি না। ঝুলে থাকা এই বিপুল অর্থ যেন আমাদের প্রশাসনিক অদক্ষতা ও পরিকল্পনাহীনতার এক জীবন্ত দলিল। দাতা সংস্থাগুলোর কাছে ঋণের জন্য হাত পাতার সময় আমাদের যে তৎপরতা দেখা যায়, সেই টাকা দেশের কাজে লাগানোর বেলায় ঠিক ততটাই উদাসীনতা প্রকাশ পায়।
নথি বলছে, বিশ্বব্যাংক, জাপান আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো সংস্থাগুলো দুহাত উজাড় করে টাকা দিচ্ছে। কিন্তু সেই টাকা আটকে আছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার চোরাবালিতে। ভূমি অধিগ্রহণের সমস্যা কাটছে না। দরপত্র প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর হচ্ছে না। এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে? টাকা না পেয়ে প্রকল্প আটকে থাকার গল্প আমরা জানি। কিন্তু টাকা পেয়েও তা খরচ করতে না পারার এই অক্ষমতা এক চরম ট্র্যাজেডি। যে টাকা দেশের সড়ক, সেতু বা স্বাস্থ্য খাতের চেহারা বদলে দিতে পারত, তা আজ শুধু ফাইলের পাতায় বন্দি। আমলাতন্ত্রের এই লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আসলে আমাদের সামগ্রিক উন্নয়নকে এক তিমিরে নিমজ্জিত করছে।
আসলে গলদটা গোড়াতেই। অনেক সময় সঠিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না করেই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ফলে কাজ শুরু হতেই একের পর এক জটিলতা মাথা চাড়া দেয়। পাঁচ বছরের প্রকল্প অনায়াসে সাত বা আট বছরে গিয়ে ঠেকে। বারংবার নকশা বদলানো হয়, বাড়ে বাজেট। এর ওপর রয়েছে প্রকল্প পরিচালকদের অদক্ষতা ও উন্নয়ন সহযোগীদের কঠিন শর্তের বেড়াজাল। বিশ্বব্যাংকের অনেক প্রকল্প তো এখন ‘রুগ্ণ প্রকল্প’ হিসেবে চিহ্নিত। দাতা সংস্থাগুলো এখন বাধ্য হয়ে ভাবছে, এক খাতের টাকা অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া যায় কি না। এটি আমাদের জন্য কোনো গৌরবের কথা নয়, বরং একধরনের রাষ্ট্রীয় লজ্জা। আন্তর্জাতিক মহলে এর ফলে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ হয়। এসবের পাশাপািশ ইআরডির সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী শফিকুল আযমের মতে, ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে মনিটরিংয়ের বিকল্প নেই। বাস্তবায়ন হার যত বেশি হবে, অর্থছাড়ও কাঙ্ক্ষিত হবে।’
উন্নয়ন কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, এটি একটি ধারাবাহিক ও দক্ষ প্রক্রিয়া। শুধু প্রতিশ্রুতির অঙ্ক বাড়িয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার দিন শেষ। পাইপলাইনের এই জট না খুললে ঋণের বোঝাই কেবল বাড়বে, সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না। বৈদেশিক সাহায্যের সঠিক ব্যবহার না হলে পরনির্ভরশীলতার গ্লানি কোনো দিন ঘুচবে না। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব প্রকল্প ধীরগতি বা দীর্ঘদিন ধরে এগোচ্ছে না, সেসব প্রকল্পের প্রতিশ্রুত অর্থ অন্য কোনো প্রকল্পে ব্যবহার করা যায় কি না— এ বিষয়ে আলোচনা অনেকদূর এগিয়েছে। সরকারের উচিত প্রকল্প বাস্তবায়নে কড়া নজরদারি নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহি তৈরি করা। প্রশাসনকে বুঝতে হবে, সিন্দুকের টাকা যতক্ষণ না মানুষের কল্যাণে রাস্তায় নামছে, ততক্ষণ তা কেবলই কিছু অর্থহীন সংখ্যা মাত্র। সরষের ভেতরের ভূত তাড়াতে না পারলে এই বিপুল অর্থ পাইপলাইনেই মরচে ধরবে, দেশের ভাগ্য বদলাবে না।




