আগামীর চোখ
এ সমাজকে সমীহ করব কেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রিয়
সমাজ,
এই ভূখণ্ডে মায়েরা জনমদুঃখী। আমি যখন মা হয়ে উঠিনি, তখনো কোনো না কোনোভাবে একজন নারী হিসেবে বিভিন্ন সময় বৈষম্যের শিকার হয়েছি। হয়তো আমি তা বুঝতেও পারিনি। সমাজে এমনই স্বাভাবিক করে রাখা হয়েছে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। আর নারী যদি মা হন, সন্তান লালনপালনে অনেকটা একাই তাকে লড়ে যেতে হয়। তার ওপর কোনো মায়ের কোলে যদি আমার সন্তানের মতো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু আসে– সেক্ষেত্রে এ সমাজে তাকে নিয়ে টিকে থাকার লড়াইটা চালিয়ে যাওয়া কতটা কঠিন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমি নাজনীন। আপনারা আমার কথা মনে করতে পারবেন না। কারণ, আমার কষ্ট কখনোই অনুভব করেননি আপনারা। তাই মনে থাকার প্রশ্নও আসে না। আমি যখন আমার সন্তানকে এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি করানোর চেষ্টা করলাম, তখন তারা আমাকে ফিরিয়ে দিল। আমার সন্তান আর পাঁচজন ছেলেমেয়ের মতো নয়, এই ছিল তার অপরাধ। অথচ তারা আইনত আমার সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করাতে বাধ্য ছিল। আমার জানামতে, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সরকারি স্কুলে ভর্তিতে বাধা দেওয়া বা তাদের ফিরিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি তো বটেই, শাস্তিযোগ্য অপরাধও। ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’-এ বলা হয়েছে, অন্য সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধু প্রতিবন্ধকতার কারণে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো শিশুর ভর্তির আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না। তাহলে কেন আমার সন্তানকে ভর্তি নেওয়া হলো না? এ সমাজ কেন সেদিন আমার সন্তানের পাশে দাঁড়াল না? জানি, কোনো উত্তর আপনাদের কাছে নেই। চাইও না। আমাকে বাধ্য হয়েই স্কুল খুলতে হলো। অথচ এই দায়িত্ব তো সমাজের নেওয়ার কথা! সমাজ কোথায়? আদৌ কি আপনাদের অস্তিত্ব রয়েছে? আমার তো মনে হয় না।
আমার সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানো নিয়ে যখন অকূলপাথারে পড়েছিলাম, তখন সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, এমন অসংখ্য মা রয়েছেন, যারা নিজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানকে স্কুলে পড়ানোর বিষয়ে সংকোচ বোধ করেন। ওই সন্তানদের জন্য আমি স্কুল খুললাম। ওই মায়েদের ভেতর নিজেকেই খুঁজে পেলাম। তারা সমাজের তথাকথিত লজ্জার বর্ম ভেঙে আমার মতো বেরিয়ে আসতে পারেননি। যে সমাজ আমাদের সন্তানদের পাশে দাঁড়ায়নি, তাকে সমীহ করার কোনো কারণ আছে কি?
ইতি
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর মা




