সেই প্রকল্প বিলাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মেগা প্রকল্পের ব্যাপারে আমাদের সরকারগুলো বরাবরই আগ্রহী। পতিত আওয়ামী সরকারের অন্যতম সমালোচনার বিষয় ছিল ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প। বেশি খরচ দেখিয়ে, পরে খরচ আরও বাড়িয়ে লুটপাটের এক মহোৎসবে পরিণত হয়েছিল এসব প্রকল্প। তবে চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর উন্নয়নের নামে দুর্নীতির এ উৎসব বন্ধ হবে এরকম প্রতিশ্রুতি আমরা পেয়েছিলাম দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সে প্রতিশ্রুতি পূরণ করা খুব দুরূহ।
বৃহস্পতিবার ‘আগামীর সময়’-এ ‘মেট্রোরেল চালাতে মনোরেল ওড়াতে টানাটানি’ শিরোনামের খবরে জানা যাচ্ছে, চট্টগ্রামের গণপরিবহনে গতি আনতে এমআরটি (মাস র্যাপিড ট্রানজিট) বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে চলছে টানাহেঁচড়া। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) যখন তিন বছর ধরে নগরটিতে মেট্রোরেলের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে, তখন সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে ৩০ হাজার কোটি টাকার ‘মনোরেল’ প্রকল্প নিয়ে এগোচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। চসিক এর মধ্যে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকও (এমওইউ) সই করেছে। এখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে স্থানীয় সরকারের পদক্ষেপ ও কার্যক্রমের গতি বেশ লক্ষণীয় বটে।
সংস্থাগুলোর এ টানাপড়েনের মধ্যে একপক্ষের দাবি— অবকাঠামোগত কারণে মেট্রোরেল বাস্তবায়নের জন্য চট্টগ্রাম উপযোগী নয়। পাল্টা জবাবে বলা হচ্ছে, নগরের বিপুল যাত্রীর চাপ নিরসনে মনোরেল কোনো কাজে আসবে না। মনোরেল দিনে ১৮ হাজার যাত্রী বহন করবে অার মেট্রোরেল করবে সাড়ে ৬ থেকে ১১ লাখ।
দুই সংস্থার এ টানাটানি দেখে বেশ কৌতুক অনুভব করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। তারা এ দুই সংস্থার প্রকল্প পরিকল্পনাকে ‘মেগা প্রকল্প বিলাস’ বলে অভিহিত করছেন। তাদের স্পষ্ট মত, চট্টগ্রামে ৩০-৫০ হাজার কোটি টাকা ঢেলে মেট্রোরেল বা মনোরেল কোনোটিরই আসলে প্রয়োজন নেই। তার বদলে মাত্র হাজার কোটি টাকা খরচ করে নগরের ট্রাফিক ও বিদ্যমান বাস রুটব্যবস্থা ঢেলে সাজালেই যানজটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
ফলে আমাদের মনে এ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যে, বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সংস্থার লোকজন আবার সেই পুরনো আবর্তেই ফিরে যাচ্ছেন কি না। অর্থাৎ প্রয়োজন থাক বা না থাক, বড় বড় প্রকল্প বানিয়ে অর্থকড়ি লোপাটের একটা অসৎ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেছেন, ব্যয়বহুল প্রকল্প বাস্তবায়নের
সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ড. হাসানের এ
মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। অামরা অাশা করি, সরকারসহ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রকৃত বিষয়টি অনুধাবন করবেন। অহেতুক ও গণস্বার্থবিরোধী ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প থেকে সরে আসবেন।
চট্টগ্রামের মেট্রোরেল বা মনোরেলের মতো জনবিচ্ছিন্ন, পরিবেশ-বিধ্বংসী এবং অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক বিলাসিতা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত। আমাদের এখন দরকার টেকসই, সাশ্রয়ী এবং বাস্তবসম্মত উন্নয়ন, কোনো স্বৈরাচারী শাসনের লুটপাটের স্মারক নয়, নয় হঠকারী সিদ্ধান্ত। জনস্বার্থকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক পকেট ভরার যেকোনো অপচেষ্টা বন্ধ হোক, এটাই আমাদের চাওয়া। গত দেড় দশকে ‘উন্নয়ন’ শব্দটি একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এমনটা জাতি অার প্রত্যাশা করে না।




