সম্পাদকীয়
শিশুর জীবনের দামে আর কত অবহেলা?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশ জুড়ে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কমাতে সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হলেও প্রতিদিন নতুন করে শিশুর প্রাণহানি ও সংক্রমণের ঘটনা ঘটছে। আমাদের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতের এই নির্মম বৈপরীত্য আর কতদিন সহ্য করতে হবে?
সম্প্রতি বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট (বিএসএইচআই) এবং আইসিডিডিআর,বির যৌথ গবেষণায় যে তথ্য উঠে এসেছে, তা শুধু উদ্বেগের নয়; বরং চরম আতঙ্কের। দুই ডোজ প্রতিষেধক টিকা পাওয়ার পরও দেশের ৭৬ শতাংশ শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে! টিকাদানের পরও যদি তিন-চতুর্থাংশ শিশু মরণব্যাধিতে ধুঁকতে থাকে, তবে এই টিকার গুণগত মান, কোল্ড চেইন রক্ষা এবং আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক ও অবধারিত।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নমুনা পরীক্ষায় ৯৫ শতাংশের দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং ৩ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুর আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি (৪৩ শতাংশ)। আরও মর্মান্তিক হলো, হামে আক্রান্ত শিশুর মধ্যে ৬৫ শতাংশ অপুষ্টির শিকার এবং মৃত শিশুর ৮২ শতাংশই শৈশবে পর্যাপ্ত বুকের দুধ পায়নি। বাল্যবিয়ে, অসচেতনতা ও মা-শিশুর অপুষ্টির যে চিত্র এই তথ্যে ফুটে উঠেছে, তা সরকারের সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তাবলয়ের চরম ব্যর্থতাকে উন্মোচিত করে। হাসপাতালে চিকিৎসা পেয়ে সুস্থ হওয়ার পর পুনরায় শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে— এমন পরিস্থিতি একটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য চরম ধিক্কারজনক।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের টিকাদান ক্যাম্পেইনে নীতিগত গাফিলতি, পর্যাপ্ত মাঠকর্মীর অভাব ও সময়মতো উদ্যোগ না নেওয়ার ফলেই আজকের এই মহামারী এবং ইমিউনিটির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই গাফিলতি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ভুল নয়; এটি হাজারো শিশুকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার শামিল। অবাস্তব আশ্বাস না দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসতে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রশাসনিক গাফিলতি ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে তৈরি হওয়া এই জনস্বাস্থ্য সংকটে প্রতিদিন যে শিশুদের প্রাণ ঝরছে, সেই অপূরণীয় ক্ষতির দায়ভার কে নেবে?
হাজারটা আইসিইউ বা ভেন্টিলেটর বসিয়ে যে হামের মতো চরম সংক্রামক ব্যাধি রোখা যায় না, তা সর্বজনবিদিত। গণটিকাদান কর্মসূচিকে কার্যকর করা, ভ্যাকসিন সরবরাহের কোল্ড চেইন ও মান নিশ্চিত করা এবং প্রারম্ভিক ইমিউনিটি তৈরিতে ব্যর্থতার যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। কেন দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও শিশুরা সুরক্ষা পাচ্ছে না— তার বৈজ্ঞানিক ও প্রশাসনিক কারণ অনুসন্ধানে অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে ছয় মাসের কম বয়সী শিশু ও কিশোরীদের বিশেষ টিকাদানের আওতায় আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত অবিলম্বে গ্রহণ করতে হবে।
শিশুরা কোনো ভুল নীতি বা প্রশাসনিক অবহেলার গিনিপিগ হতে পারে না। প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি, টিকাদান ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, শূন্যপদে দ্রুত কর্মী নিয়োগ এবং তৃণমূল স্বাস্থ্যে শিশুদের পুষ্টি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায়, স্বাস্থ্য খাতের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক চরম অনিশ্চয়তা ও স্থায়ী পঙ্গুত্বের মুখে ঠেলে দেবে।






