আগামীর চোখ
রাস্তা যেন পুলসিরাত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রিয়
বখতিয়ার,
এই চিঠিটা লিখছি গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে। চারদিকে চিল-চিৎকার। বাসের হর্ন। কন্ডাক্টরের হাঁকডাক। একটা দূরপাল্লার বাসে চেপে বসেছি। সিটবেল্ট নেই। তবে সিটটা আঁকড়ে ধরে আছি। ভয় পাবি না, একটু দোয়া-দরুদ পড়িস আমার জন্য।
আজকের খবরের কাগজটা পড়েছিস? বুকটা কেঁপে উঠল রে। ইদানীং আমাদের দেশের সড়কগুলো নাকি লেবানন যুদ্ধের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে! মাত্র ১৫ দিনে ৪০২টি প্রাণ হাওয়া! ওদিকে ইসরায়েলি বোমায় মরল ৪৮২ জন। আমরা স্রেফ বাস-ট্রাকের টক্করেই চারশ পার করে দিলাম! ভাবা যায়?
রাস্তাঘাটের যা হাল, তাতে একে আর ‘যোগাযোগব্যবস্থা’ বলা চলে না। এটা স্রেফ একটা জুয়াখেলার আসর। লটারি। বাড়ি পৌঁছালে ওস্তাদ, না পৌঁছালে লাশ। ড্রাইভার মহাশয়রা যেভাবে স্টিয়ারিং ঘোরান, মনে হয় মিগ-২৯ বিমান চালাচ্ছেন। আর হাইওয়েগুলো যেন একেকটা কুরুক্ষেত্রের ময়দান। অর্ধেক দুর্ঘটনা ওখানেই ঘটছে। এবারের পরিসংখ্যান গত বছরের রেকর্ডকেও টপকে গেছে। এই-ই আমাদের উন্নতি— মরার বেলাতেও কম যাচ্ছি না!
মাথায় একটা মোক্ষম বুদ্ধি এলো। আচ্ছা, আমাদের সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রণালয়টাকে তুলে দেওয়া যায় না? ওটার তো আর কোনো কার্যকারিতা দেখছি না। তার চেয়ে বরং এই গোটা দপ্তরটাকে ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়’-এর আন্ডারে দিয়ে দেওয়া হোক। এটা তো একটা জাতীয় দুর্যোগ!
আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো ঘোষণা হবে— আজ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৫ নম্বর মহাবিপদ সংকেত চলছে
রাস্তায় বের হওয়া মানেই তো সাইক্লোন, টর্নেডো আর ভূমিকম্পের মুখোমুখি হওয়া। যদি দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে যায়, অন্তত কিছু সুবিধা তো পাব! বাস ছাড়ার আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো ঘোষণা হবে— ‘আজ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৫ নম্বর মহাবিপদ সংকেত চলছে। যাত্রীরা সাবধানে বাসে উঠুন।’ অ্যাকসিডেন্ট হলে অন্তত রেড ক্রিসেন্টের ভলান্টিয়াররা ছুটে আসবেন। এয়ারলিফট করে আমাদের উদ্ধার করবেন। মুড়ি-চিড়ার ত্রাণ পাওয়া যাবে।
বাসের ইঞ্জিন স্টার্ট দিল ভাই। বুকটা ঢিপঢিপ করছে। জানালার বাইরে তাকালাম। যেন যমরাজ মুচকি হাসছেন। অলরেডি অন্য একটা বাসকে ওভারটেক করে ড্রাইভার প্রশংসা শুনছে হেলপারের। হেলপার আরও জোরে হাঁক দিল— ‘ওস্তাদ ডানে চাপান!’
আমি চোখ বন্ধ করলাম। যদি অক্ষত অবস্থায় পৌঁছাতে পারি, তবে আবার চিঠি লিখব। আর যদি না ফিরি, ধরে নিবি— তোর বন্ধুটিও ওই চারশ দুইয়ের পর কোনো একটা সংখ্যা হয়ে গেছে। ভালো থাকিস। রাস্তা
পার হবি সাবধানে...।
ইতি
তোর ভীত বন্ধু





