সম্পাদকীয়
খবরদারির বিমানবন্দর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের অন্যতম কেপিআই (Key Performance Indicator) ও প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চরম অরাজকতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। যে বিমানবন্দরে লাখ লাখ যাত্রীর যাতায়াত এবং সংবেদনশীল জাতীয় নিরাপত্তা জড়িত, সেখানে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিন্ন নীতিমালা ও পূর্ণাঙ্গ অনলাইন ব্যবস্থা ছাড়া শুধু মৌখিক নির্দেশ, ব্যক্তিগত পরিচিতি কিংবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সুপারিশে অকাতরে বিলানো হচ্ছে অস্থায়ী পাস। এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতাই নির্দেশ করে না; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের বিমানবন্দর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে এক মহাঝুঁকিপূর্ণ ও তামাশার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আগামীর সময়-এ বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমনটাই দেখা যাচ্ছে।
গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে এই অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নগ্ন ছবি। মাত্র পাঁচ দিনে ইস্যু হওয়া ৮০টি পাসের মধ্যে একটি বাহিনীর রেফারেন্সে ৩৪টি, শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ (এভসেক ও ডিএসওসহ) ১৪টি, বেবিচক সদর দপ্তর ১১টি, সচিবালয় চারটি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চারটি, অন্য একটি নিরাপত্তা বাহিনী তিনটি, বিদেশি দূতাবাস দুটি, পুলিশ দুটি, বেসরকারি ব্যাংক দুটি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রেফারেন্সে বাকি পাসগুলো ইস্যু করা হয়েছে। এমন চিত্র প্রায় সবসময়ের।
অথচ একই জায়গায় অন্যান্য সরকারি সংস্থা বা জরুরি প্রয়োজনে আসা সাধারণ মানুষের বেলায় চাপিয়ে দেওয়া হয় অযৌক্তিক শর্ত ও চরম বিধিনিষেধ। যেখানে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নিয়ম অনুযায়ী বিমানবন্দরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ সর্বোচ্চ কঠোর ও প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ার কথা, সেখানে এমন আনুকূল্য প্রদর্শন ও মৌখিক নির্দেশে পাস দেওয়া কেপিআই স্থাপনার সুরক্ষাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা অপরাধী চক্র যদি এই ফাঁক গলে প্রবেশ করে, তবে তার দায়ভার কে নেবে?
অন্যদিকে, এই বিমানবন্দরেই আবার সাধারণ ও বৈধ যাত্রীদের ওপর চালানো হয় অযাচিত আমলাতান্ত্রিক নিপীড়ন ও বৈষম্য। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও নেপালগামী তিন তরুণীকে বিমানবন্দরে অহেতুক আটকে দেওয়া হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বেঞ্চ (বিচারপতি কামরুল কাদের ও ফাতেমা আনোয়ার) রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন— কেন এই বিদেশযাত্রায় বাধাকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যমূলক ঘোষণা করা হবে না?
প্রশাসনের এই দ্বিচারিতা পুরো ব্যবস্থাটির প্রতিই তীব্র ক্ষোভ ও বিতৃষ্ণা তৈরি করে। ক্ষমতাবানদের বেলায় মৌখিক নির্দেশে নিরাপত্তা ডিঙিয়ে প্রবেশ করার বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়, আর সাধারণ বৈধ নাগরিকদের ক্ষেত্রে অহেতুক হাত-পা বেঁধে হয়রানি ও অন্যায্য ক্ষমতার দাপট দেখানো হয়।
স্ক্যানার বসানো কিংবা বড় বড় কথা বলাই নিরাপত্তার একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না; প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যদি এভাবে সুপারিশ ও স্বজনপ্রীতির আখড়া হয়, তবে নিরাপত্তার পুরো কাঠামোটাই ধসে পড়তে বাধ্য। অবিলম্বে পাস ইস্যুর পুরো প্রক্রিয়াটি কেন্দ্রীয়ভাবে স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর অনলাইন সিস্টেমে রূপান্তর করতে হবে এবং সর্বস্তরে কড়া জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর স্থানে কোনো ব্যক্তির মুখে মুখে দেওয়া নির্দেশ বা সুপারিশে প্রবেশাধিকার প্রদান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে, অন্যথায় দেশের সার্বিক নিরাপত্তাকে এভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলার জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি।



