মন্ত্রী হয়ে কী করেন আমলারা

সংগৃহীত ছবি
সাবেক আমলা যখন মন্ত্রী হন, তখন তাদের ভূমিকা রাজনীতিবিদ-মন্ত্রীদের চেয়ে কিছুটা আলাদা বৈশিষ্ট্য পায়। প্রশাসনিক কাঠামো ভালো বোঝেন। দক্ষতা থাকে বাজেট বা নীতিপত্র প্রণয়নে। তারা রাজনীতিক-মন্ত্রীদের চেয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কারণ আমলাতন্ত্রের ভেতরকার সংস্কৃতি, ফাইল-চালাচালি এবং ক্ষমতার অদৃশ্য স্তরগুলো জানেন। আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে দরকষাকষিতে সুবিধা হয়।
সাবেক আমলারা মন্ত্রণালয় চালাতে গিয়ে খুব বেশি সাফল্যের নজির সৃষ্টি করতে পারেন নি। তারা আমলার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করতে প্রায় সময়ই ব্যর্থ হন। তারা মন্ত্রীত্বকে ৯-৫ অফিস করার মতোই ভাবেন। সাবেক আমলা মন্ত্রী হলে ‘রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বনাম প্রশাসনিক দক্ষতা’— এই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। সরকারের ওপর আমলাতন্ত্রের প্রভাব ঝেঁকে বসে। তখন রাজনৈতিক জবাবদিহির বদলে প্রশাসনিক স্বার্থ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। মন্ত্রী হয়ে মনে রাখার মতো সার্ভিস দিয়েছেন কিছু আমলা। আবুল মাল আবদুল মুহিত সিএসপি অফিসার ছিলেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার হাত ধরেই দেশের অর্থনীতি শক্ত ভিত পেয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন সাবেক আমলা আব্দুল মান্নান। তার স্বচ্ছতাও সুবিদিত। বিএনপি’র ১৯৯১-১৯৯৬ শাসনামলে সাবেক আমলা নুরুল হুদা সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। প্রশাসনিক নানা সিদ্ধান্তে তার নাম জড়িয়ে আছে। এম কে আনোয়ার কৃষিমন্ত্রী ছিলেন। তার আগে তিনি ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। কেরামত আলী ছিলেন সিএসপি অফিসার। পরে তিনি নৌপরিবহন মন্ত্রী হয়েছিলেন। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান ছিলেন সামরিক কর্মকর্তা।
এবারও সাবেক আমলারা এমপি হয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এমপি হয়েছেন সাবেক সিএসপি মুশফিকুর রহমান। তিনি বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। সাবেক আমলাদের মধ্যে যারা এমপি হয়েছেন তাদের মধ্যে বিএনপির সালাহউদ্দীন আহমদও রয়েছেন। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের এ সদস্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব ছিলেন। নির্বাচনকালীন দল পরিচালনায় তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের ঐক্যমত্য কমিশনে বিএনপির পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে তিনি দলটির স্বতন্ত্র অবস্থান যৌক্তিকভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি পুরো সরকার পরিচালনায়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে ধারণা। তাছাড়া গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়তো তার দখলে থাকবেই।
দ্বাদশ সংসদেও অনেক সাবেক আমলা এমপি হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে র.আ.ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক একান্ত সচিব ছিলেন।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে এমপি হয়েছিলেন সাজ্জাদুল হাসান। তিনি আমলা ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। অবসর নেওয়ার পর ছিলেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চেয়ারম্যান। এরপর তিনি সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন।
শেখ হাসিনার সময়ে সরকারের সবচেয়ে প্রভাবশালী আমলাদের অন্যতম ছিলেন আবুল কালাম আজাদ। তিনি বিদ্যুৎ সচিব ছিলেন। পরে ইআরডি সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও এসডিজি-বিষয়ক সমন্বয়ক হিসাবেও নিয়োজিত ছিলেন তিনি। দেশের বিদ্যুৎ খাত বেসরকারি উদ্যোক্তানির্ভর (আইপিপি) হয়ে উঠেছিল তার হাত ধরেই। শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জামালপুর-৫ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে এমপি হয়েছিলেন তিনি। তবে বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান অব্যবস্থাপনা ও আর্থিক চাপ তৈরির জন্য অনেকাংশেই দায়ী করা হয় সাবেক এই বিদ্যুৎ সচিবকে। তিনি মন্ত্রী না হতে পারলেও সরকারে তার প্রভাব অনেক মন্ত্রীদের চেয়ে বেশি ছিল।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছিলেন এ ৮২ ব্যাচেরই আরেক আমলা মোহাম্মদ সাদিক। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সাবেক এ চেয়ারম্যান গত নির্বাচনে এমপি হন সুনামগঞ্জ-৪ আসন থেকে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিও করা হয় তাকে। প্রশাসনে থাকাকালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (বিয়াম) ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমির পরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

