প্রবাসী শ্রমিকদের নির্মম ভাগ্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গ্রামের কোনো ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে। তাকে বিদায় দিতে প্রায় পুরো গ্রাম ভেঙে পড়েছে। অধিকাংশই নারী। সবার চোখে অশ্রু। ছেলেটিকে বহন করা গাড়ি দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে যাওয়া পর্যন্ত ঠায় দাঁড়িয়ে আছে সবাই। এ দৃশ্য বহুবার দেখেছি গ্রামে। প্রযুক্তির কল্যাণে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা সম্ভব হওয়ায়, বিদায়ের সেই ভিড় এখন অনেকটাই কমেছে। কিন্তু প্রিয়জনের উৎকণ্ঠা আজও কমেনি।
আর এই উৎকণ্ঠা এক নির্মম বাস্তবতা। পরিবারের অর্থনৈতিক হাল ধরার আশায় যে তরুণরা মরুভূমির বুকে নিজেদের ঘাম ঝরাতে যান, তাদের একটি অংশ ফিরছেন কফিনবন্দি হয়ে। মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষত সৌদি আরব থেকে প্রবাসী শ্রমিকের লাশ হয়ে দেশে ফেরার এ মিছিল কিছুতেই থামছে না। কিছুদিন আগেই রিয়াদের একটি সোফা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক।
সৌদির সোফা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনা এবারই প্রথম নয়। সংবাদমাধ্যমের তথ্য বলছে, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত শুধু সোফা কারখানাতেই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ৪২ প্রবাসী শ্রমিক। কর্মক্ষেত্রের ন্যূনতম নিরাপত্তা না থাকা, রাসায়নিক উপাদানের পাশে অপরিকল্পিত বসবাস এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার চরম অপ্রতুলতার কারণেই বারবার ঘটছে এমন ট্র্যাজেডি।
মারা যাওয়া শ্রমিকদের সঙ্গে শেষ হয়ে যায় তাদের পরিবারও। স্বজন হারানোর আঘাত যেমন পরিবারগুলোকে আমৃত্যু বয়ে েবড়াতে হয়, তেমনি যোগ হয় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। আর যারা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারান, তাদের পরিস্থিতি হয় সবচেয়ে করুণ।
দুর্ঘটনা ঘটলে দুয়েকটি শোকবার্তা আর সাময়িক ক্ষতিপূরণের ঘোষণাতেই দায়িত্ব শেষ করে সরকার। কিন্তু দুর্ঘটনার মূল কারণ অনুসন্ধান; কিংবা প্রবাসীদের জন্য সুরক্ষিত কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার জন্য যে কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন, সে বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয় না। পুরো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অনেকটাই প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করছে। অথচ রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত তো দূরের কথা, তাদের প্রাপ্য মজুরি পাইয়ে দিতেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।
প্রবাসী নারী শ্রমিকদের পরিস্থিতিও ভয়াবহ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকরা মূলত গৃহকর্মীর কাজ করতে যান।
এমনও হয়েছে, সহকর্মীরা টাকা জোগাড় করে মরদেহ দেশে পাঠিয়েছেন। মরদেহ আনার খরচ বহন করার সাধ্যও অনেক প্রবাসী শ্রমিকের পরিবারের নেই
কিন্তু সেখানে পৌঁছে তারা মুখোমুখি হন নির্মমতার। কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার পরপরই অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের পাসপোর্ট এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। ফলে এই নারী শ্রমিকরা বন্দিদশায় দিন কাটান। তাদের সহ্য করতে হয় অমানুষিক শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যমতে, ২০১৯ সাল থেকে অন্তত ৬৯ হাজার ৯০ নারী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে ফিরেছেন। তাদের বড় একটি অংশ শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতন, খাদ্যাভাব, বকেয়া বেতন ও অতিরিক্ত কাজের চাপের শিকার হয়েছেন।
অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও সুরক্ষায় প্রতিবেশী দেশ ভারতের গৃহীত মডেলের দিকে তাকালে বোঝা যায়, বাংলাদেশের শ্রমিকরা আসলে কী কী অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ভারত তাদের শ্রমিকদের সুরক্ষায় চারটি কাঠামোতে কাজ করে আসছে।
অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় প্রথমত, ভারত সর্বনিম্ন সুপারিশ করা মজুরি নীতি অনুসরণ করে। গন্তব্য দেশের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করে ভারত সরকার পেশাভিত্তিক যে সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ করে দেয়, কূটনৈতিক মিশনগুলো ভিসা অনুমোদনের সময় তা কঠোরভাবে যাচাই করায় নিয়োগকর্তারা ইচ্ছা অনুযায়ী কম বেতনে কর্মী নিয়োগের সুযোগ পান না। দ্বিতীয়ত, ই-মাইগ্রেট, প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়। সেখানে এজেন্সি, নিয়োগকর্তা ও কর্মীর চুক্তিপত্র সরাসরি যুক্ত থাকে। ফলে কোনো নিয়োগকর্তা বেতন বকেয়া রাখা বা নির্যাতনের কারণে অভিযুক্ত হলে তাকে সিস্টেমে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। তিনি আর নতুন কর্মী নিয়োগ দিতে না পারেন।
তৃতীয়ত, ‘প্রবাসী ভারতীয় বীমা যোজনা’র মাধ্যমে নামমাত্র প্রিমিয়ামে বাধ্যতামূলক বীমাসুবিধা দেওয়া হয়। এর আওতায় কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বা স্থায়ী পঙ্গুত্বে প্রায় ১০ লাখ রুপি পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি অসুস্থতা, চুক্তি ভঙ্গ কিংবা আইনি জটিলতায় দেশে ফেরার বিমান খরচও বহন করা হয়। চতুর্থত, প্রবাসে থাকা শ্রমিকদের দ্রুত সহায়তায় কাজ করে ‘MADAD’ পোর্টাল ও ওয়েলফেয়ার ফান্ড। বেতনে অনিয়ম বা নির্যাতনের শিকার শ্রমিকরা সরাসরি অনলাইন পোর্টালে অভিযোগ জানাতে পারেন। সরকার ওই শ্রমিকের জন্য আইনজীবী নিয়োগ ছাড়াও জরুরি পরিস্থিতিতে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থাও করে।
প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণে ভারতের এই সুসংগঠিত কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের অভিবাসন খাতের নানা ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যদিও জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভিবাসন খাত পরিচালিত হচ্ছে এবং ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপের মতো প্রযুক্তির ব্যবহারও শুরু হয়েছে— তবে বাস্তবায়ন ও তদারকির জায়গায় এখনো বড় ধরনের দুর্বলতা রয়ে গেছে। বাংলাদেশে সর্বনিম্ন বেতনের স্পষ্ট প্রয়োগ না থাকায় মধ্যস্থতাকারী বা দালাল চক্রের প্রভাবে প্রবাসীরা প্রায়ই নির্ধারিত বেতনের চেয়ে অনেক কম টাকায় কাজ করতে বাধ্য হন। ফলে একই প্রতিষ্ঠানে সমমানের কাজ করেও একজন ভারতীয় কর্মীর চেয়ে বাংলাদেশি কর্মী কম বেতন পান। আর মারা গেলে তো অনেক সময় মরদেহটি দেশে আসতেও কয়েক মাস লেগে যায়। এমনও হয়েছে, সহকর্মীরা টাকা জোগাড় করে মরদেহ দেশে পাঠিয়েছেন। মরদেহ আনার খরচ বহন করার সাধ্যও অনেক প্রবাসী শ্রমিকের পরিবারের নেই। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত দেশের শ্রমিকদের ভাগ্য এমনই নির্মম।
লেখক: সাংবাদিক






