বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক সাংস্কৃতিক বন্ধন থেকে প্রযুক্তি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৬ অক্টোবর সোমবার জাপান সফরে যাচ্ছেন। এ সফর ভবিষ্যৎ সহযোগিতার এমন কিছু প্রস্তাব উত্থাপন করা প্রয়োজন, যা দুই দেশের সম্পর্ককে অর্থনৈতিক সহায়তা ও শ্রমবাজারের গণ্ডি পেরিয়ে জ্ঞান, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং মানুষের পারস্পরিক কল্যাণের ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী করবে।
বাংলা ও জাপানের সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ইতিহাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক বন্ধনেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ১৯০২ সালে জাপানি শিল্পচিন্তাবিদ ওকাকুরা কাকুজো, যিনি ওকাকুরা তেনশিন নামে বেশি পরিচিত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাদের পরিচয় ও পারস্পরিক ভাববিনিময় শুধু দুই ব্যক্তির বন্ধুত্বের ইতিহাস নয়; বরং এশীয় সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য, আত্মপরিচয় এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক মূল্যবান অধ্যায়। ১৯০৭ সালে জাপানি সাবান তৈরির কারিগর উয়েমোন তাকেদা ঢাকার এক ব্রাহ্ম পরিবারের কন্যা হরিপ্রভা মল্লিককে বিয়ে করেন। ঢাকায় সাবানের কারখানা স্থাপন করে তিনি ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করেন। তার পরিবারের আরেক সদস্য সোয়েমোন তাকেদাও ঢাকায় রানি নামে আরেক নারীকে বিয়ে করেন। এসব ঘটনা সে সময়ের সামাজিক পরিবেশে দুই দেশের মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক অভিযোজন এবং পারস্পরিক আস্থার পরিচয় বহন করে।
১৯০৮ সালে জাপানি বৌদ্ধভিক্ষু কিমুরা নিক্কি পালি ভাষা ও বৌদ্ধধর্ম অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামে যান। তার এই যাত্রা ছিল জাপান ও বাংলার মধ্যে ধর্মীয় ও বৌদ্ধিক যোগাযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। বিশ শতকের প্রথমার্ধে, বিশেষ করে ১৯০৫-৪১ সালের মধ্যে, পূর্ববঙ্গের কিছু বাঙালি আধুনিক প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে জাপানে গিয়েছিলেন। জাপানের দ্রুত শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং শিক্ষাব্যবস্থা তাদের আকৃষ্ট করেছিল। জাপানের সঙ্গে শিক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়িয়ে বাংলাদেশ আবারও সেই ঐতিহাসিক ধারাকে নতুনভাবে এগিয়ে নিতে পারে।
বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্কের ইতিহাসে বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। এই বাঙালি আইনজ্ঞ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর টোকিও ট্রাইব্যুনালে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৮ সালে দেওয়া তার পৃথক বিচারিক অভিমত আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি ট্রাইব্যুনালের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হননি এবং অভিযুক্ত জাপানি নেতাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিচার ও দায় নির্ধারণ নিয়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছিলেন।
বাংলাদেশ জাপানের কাছ থেকে বহু বছর ধরে সহযোগিতা পেয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশ বিনিময়ে জাপানকে কী দিতে পারছে?
তার অভিমত জাপানে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। দেশটিতে তার স্মৃতিফলক ও স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন করা হয়েছে। তবে তার ভূমিকা তুলে ধরতে হলে ইতিহাসের জটিলতা ও বিচারিক মতভেদের বিষয়টি যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে রাধাবিনোদ পালের অবদান স্মরণ করা হলে তা দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধনকে আরও অর্থবহ করে তুলবে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জাপানের সমর্থন বাংলাদেশের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনেও জাপান উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা দিয়েছে। পরবর্তী কয়েক দশকে অবকাঠামো, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, শিল্পায়ন, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাপানের সহায়তা বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ থেকে জাপানে কর্মী পাঠানো দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে এ সম্পর্ককে শুধু শ্রমিক সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি, যার মাধ্যমে জাপানের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে বিশেষ বৃত্তি, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বিনিময় কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলোও দক্ষ কর্মী ও নতুন বাজারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবে।
জাপানের সহযোগিতায় আধুনিক কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং প্রযুক্তি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
আরেকটি মানবিক বিষয় প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। জাপানি নাগরিকদের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ বহু বাংলাদেশি পরিবার দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী সামাজিক সেতুবন্ধ তৈরি করেছে। এসব পরিবারের জাপানি স্ত্রীদের বাংলাদেশে বসবাস, সম্পত্তির অধিকার, উত্তরাধিকার এবং পারিবারিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো আরও সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর করা দরকার। তাদের অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রবাসী বাংলাদেশিরা জাপানে কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও পারিবারিক জীবনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবদান রাখছেন এবং দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। তাদের পরিবারের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হলে দুই দেশের মানুষের মধ্যে আস্থা আরও গভীর হবে।
বাংলাদেশ জাপানের কাছ থেকে বহু বছর ধরে সহযোগিতা পেয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশ বিনিময়ে জাপানকে কী দিতে পারছে? এ প্রশ্ন কোনোভাবেই অযৌক্তিক নয়।
বাংলাদেশ জাপানকে তরুণ মেধা, উদ্ভাবনী উদ্যোগ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, সৃজনশীল শিল্প, দক্ষ মানবসম্পদ এবং একটি সম্ভাবনাময় বাজার দিতে পারে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রেও যৌথ অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এ সফর তাই শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ কিংবা আনুষ্ঠানিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায় রচিত হোক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা, জ্ঞান বিনিময় এবং মানুষের কল্যাণের ভিত্তিতে। ইতিহাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে ভবিষ্যতের জন্য এমন একটি অংশীদারত্ব গড়ে তোলাই হোক এ সফরের অন্যতম প্রধান সাফল্য।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক



