‘বাঙালি বাবু’ সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আমাদের, অর্থাৎ তৎকালীন উঠতি লেখক-কবিদের দেখা-সাক্ষাৎ হতো কফিহাউসে। কফিহাউস না থাকলে যে কী হতো, তা বলতে পারি না। ওখানেই শক্তি, সুনীল, সন্দীপন, উৎপল এবং তাবৎ তরুণ লেখক-কবি সন্ধ্যার সময় জড়ো হতো আর চলত তুমুল আড্ডা। আমাদের সকলের পকেটে তখন এক কাপ সস্তা কফি কিনবার মতো রেস্তও থাকত না। কিন্তু কফিহাউসে কেউ আমাদের হুড়ো দিয়ে উঠিয়েও দিত না। তাই পয়সা খরচ না করেও বসে থাকা যেত। ওইটেই ছিল কফিহাউসের প্রতি আমাদের টানের মুখ্য কারণ। ওই কফিহাউসেই একদিন দুটি মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে দুম করে আলাপ হয়ে গেল। একজন হাট্টাগাট্টা চেহারার অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, আরেকজন রোগাভোগা চেহারার সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। দুজনেরই বেশ কিছু লেখা তখন পড়ে ফেলেছি এবং মুগ্ধ হয়েছি। সিরাজ মুর্শিদাবাদের খোসবাসপুর গ্রামের ছেলে। বয়সে আমার চেয়ে বছর কয়েকের বড়; কিন্তু তাতে কি! আলাপ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই আমাদের তুই-তোকারি সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। মাথায় ব্যাকব্রাশ করা প্রচুর চুল, মুখে মৃদুমৃদু হাসি, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। সিরাজ তখন বিবাহিত এবং চার সন্তানের জনক; থাকত পার্ক সার্কাস অঞ্চলে একটা ছোট ফ্ল্যাটে। তার বউয়ের নাম ছিল হাসনে আরা বেগম। ভারি লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে। সিরাজেরও তখন পয়সার টানাটানি, বোধ হয় কোনো অনামা পত্রিকায় সামান্য বেতনের চাকরি করত। হাঁড়ির হাল। আমাদের সকলেরই তখন হাঁড়ির হাল। পকেট ফাঁকা, স্বপ্নের ঝাঁকামুটে হয়ে ঘুরে বেড়াই।
সিরাজের স্বভাবটি ছিল ভারি মিষ্টি। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া খুব বেশিদূর না হলেও সিরাজ বইপত্র পড়ত প্রচুর। একসময় ভালো বাঁশি বাজাত, আলকাপ দলে অভিনয় করত, পরে আলকাপের মাস্টার অবধি হয়েছিল। এই বিশাল অভিজ্ঞতা তার লেখায় যে কী অসাধারণ মাত্রা যোগ করেছিল, তা বলে শেষ করা যায় না। গল্পে-উপন্যাসে মুর্শিদাবাদের গ্রামাঞ্চলকে সে ছবির মতো তুলে আনত। আর সেই বর্ণনায় কী গভীর মায়া! অল্প সময়েই আমরা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলাম। যেকোনো বিষয়ে তর্ক করা ছিল তার প্রিয় বিষয়। আর তর্কটা হতো আমার সঙ্গেই। আমি কফিহাউসের কাছেই একটা বোর্ডিং হাউজে থাকতাম তখন। এমন অনেক দিন হয়েছে যে, কফিহাউসে শুরু হওয়া তর্ক শেষ করতে রাত ৯টার পর সে আমার ঘরে চলে আসত এবং রাত ১২টার পরও তর্ক চালিয়ে যেত। তখন বাস-ট্রাম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাকে হেঁটে বাড়ি ফিরতে হতো প্রায়ই।
হঠাৎ দেশ পত্রিকায় সে সময়ে সিরাজের একটা গল্প মনোনীত হয়ে ছাপা হয়। নামটা আজ মনে পড়ছে না, বোধ হয় ‘শেষ ট্রেন’ বা ওইজাতীয় কিছু। ওই গল্পটাই সিরাজকে রাতারাতি বিখ্যাত করে দিয়েছিল। গল্পটিও অসাধারণ। তার পর থেকেই নানা পত্রপত্রিকায় তাকে নিয়ে টানাটানি শুরু হয়। নতুন চাকরিও জুটে যায়। ফলে অর্থকড়ি সমস্যাও অনেকটা লাঘব হয়।
বরাবর সিরাজ ধুতি আর পাঞ্জাবি পরত। আমাদের মতো টি-শার্ট বা হাওয়াই শার্ট আর প্যান্ট নয়। একেবারে বাঙালি বাবু। এমনকি তাকে কখনো পায়জামা পরতেও দেখিনি। স্কুলে তার অপশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল সংস্কৃত। সম্ভবত বাংলা ভাষাটাকে ভালো করে জানার জন্যই সে সংস্কৃত পড়েছিল। তার শিক্ষিত পরিবারটি ছিল বামপন্থী। তবে সিরাজের তেমন কোনো রাজনৈতিক দলের আনুগত্য ছিল না; বরং খানিকটা মুক্তমনা ছিল সে। আর নাস্তিক। তবে নাস্তিক হলেও ভূতের ভয় ছিল প্রবল।
কিছুকাল পরে সিরাজ আনন্দবাজার পত্রিকায় সাব-এডিটরের চাকরি পেয়ে যায়। আমিও চলে যাই দক্ষিণ কলকাতায়। বিশেষ দেখা-সাক্ষাৎ হতো না। তবে কখনোসখনো ও আমার বাড়িতে এসেছে বা আমি ওর বাড়িতে গেছি। লেখক হিসেবে তার তখন বিশেষ খ্যাতি হয়েছে, বই ভালো বিক্রি হয়। হাতে টাকা-পয়সা আসছিল। তবে সিরাজ ছিল শৌখিন মানুষ। একবার দুম করে ৪০০ টাকা দিয়ে একটা ডিনার সেট কিনে ফেলল। তখন ৪০০ টাকা মানে অনেক টাকা।
ছিয়াত্তর সালে আমাকে আনন্দবাজার পত্রিকা ডেকে নেয়। তখন আমি আর সিরাজ সহকর্মী। আবার দুই বন্ধু একসঙ্গে। সে ভারি সুখের সময় ছিল। দুই বন্ধু দেদার আড্ডা দেওয়ার সুযোগ পেতাম। আমাদের দুই বন্ধুর ভাব আর তর্কাতর্কি দেখে সবাই অবাক হতো। প্রবল তর্কাতর্কি এবং আবার সাংঘাতিক ভাব তো বড় একটা দেখা যায় না!
আনন্দবাজারে চাকরি করার সময়েই সিরাজ হঠাৎ আমেরিকা যাওয়ার আমন্ত্রণ পেল; আয়ওয়া ইউনিভার্সিটির পোয়েট্রি অ্যান্ড লিটারারি রিসার্চ প্রোগ্রামে। তিন মাসের প্রোগ্রাম। খুব অনিচ্ছার সঙ্গে সে সেই প্রথম প্যান্ট আর শার্ট বানাল। তারপর গেল আমেরিকায়। তিন মাস পর ফিরে এলো সে। তখন থেকে সে প্যান্ট-শার্ট ধরল। এই নিয়ে প্রচুর ঠাট্টা-তামাশা হতো তার সঙ্গে। আমেরিকায় গিয়ে একটু স্বাস্থ্যও ফিরেছিল তার।
সিরাজ গোয়েন্দা কাহিনিও লিখত প্রচুর। তার গোয়েন্দার নাম ছিল কর্নেল। কর্নেল যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পায়। সেটি তার সিরিয়াস সাহিত্যচর্চার বিষয় ছিল না। কিন্তু দেদার খরচের হাত ছিল বলে টাকারও ভীষণ প্রয়োজন, তাই গোয়েন্দা কাহিনি লিখেই যেতে হয়েছিল তাকে। রানীঘাটের বৃত্তান্ত, অলীক মানুষ এবং আরও অনেক অসাধারণ উপন্যাসের জনক সিরাজ; কিন্তু আনন্দবাজার বা দেশ পত্রিকায় উপন্যাস লেখার তেমন সুযোগ পায়নি। আর তার জন্য কোনো অনুযোগও ছিল না তার। অলীক মানুষের জন্য সে আকাদেমি পুরস্কার পায়।
সিরাজ যেমন আমার প্রিয় বন্ধু, তেমনি প্রিয় লেখক। উত্তর জানুহবি পড়ে আমি মুগ্ধ ও বিস্মিত হই। বাংলা সাহিত্যের একটি মাইলফলক। বেশ কটা সিনেমা হয়েছিল সিরাজের গল্প আর উপন্যাস নিয়ে। প্রায় সব কটাই হিট ছবি। কিন্তু হীনস্বাস্থ্যের জন্য সে পরিশ্রম বেশি করতে পারত না। অফিসে আসবার জন্য গাড়িও কিনতে হয়েছিল তাকে। অবসরের পর ঘর থেকে বেরোনো প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। কয়েক বছর পর প্রয়াণ; কিন্তু আজও তার দগদগে স্মৃতি অমলিন আছে আমার মনে। অনেকটা শূন্যতা রেখে গেল সে।






