মব জাস্টিস প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া সভ্য সমাজের জন্য বিপজ্জনক প্রবণতা। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছেন— এমন অভিযোগ উঠল আর সেই অভিযোগের কোনো সত্যতা যাচাই বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তাকে মারধর কিংবা নির্যাতন করা কোনোভাবেই সঠিক পদক্ষেপ হতে পারে না। এমন পরিস্থিতিকেই মব জাস্টিস বলা হয়। যাকে আমরা গণপিটুনি বা জনতার হাতে বিচার নামেও চিনি। এখানে বিচার প্রক্রিয়ার জায়গা দখল করে নেয় উত্তেজনা, গুজব ও প্রতিশোধস্পৃহা। অপরাধ দমনের নামে সংঘটিত এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত আরেকটি গুরুতর অপরাধের জন্ম দেয়। ইসলামের ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসনের শিক্ষা এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে না।
মূলত মব জাস্টিসে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক প্রচলিত আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে নিজেরাই সংঘবদ্ধ হয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়। কখনো চুরি, ছিনতাই বা শিশু অপহরণের সন্দেহে; কখনো ধর্ম অবমাননা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো বক্তব্যের অভিযোগে; আবার কখনো ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কারণে মানুষ এমন সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। কোনো অভিযোগ সত্য হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মারধর, নির্যাতন বা হত্যা করার অধিকার জনতার নেই। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং অপরাধের শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব বৈধ বিচারব্যবস্থার।
মব জাস্টিসের পেছনে যেসব কারণ কাজ করে, এর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান ও বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি অনাস্থা, বিচার পেতে দীর্ঘসূত্রতা, অপরাধীর শাস্তি না হওয়ার ধারণা এবং প্রভাবশালীদের দায়মুক্তির অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় গুজব, সামষ্টিক উত্তেজনা, প্রতিশোধের মানসিকতা, রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক মেরূকরণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্যের দ্রুত বিস্তার।
ইসলাম সংবাদ যাচাই, ন্যায়বিচার এবং ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৬)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো অভিযোগকে যাচাই ছাড়াই সত্য বলে গ্রহণ করা এই নির্দেশনার পরিপন্থী। একটি মিথ্যা খবর নিরপরাধ মানুষের জীবন ধ্বংস করতে পারে। তাই উত্তেজনাকর কোনো তথ্যের ক্ষেত্রে প্রথম দায়িত্ব হলো তার সত্যতা যাচাই করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদার নিরাপত্তার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। বিদায় হজের ভাষণে তিনি মুসলমানদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মানকে পবিত্র ঘোষণা করেন। (বুখারি, হাদিস: ৬৭)
মব জাস্টিসের ভয়াবহতা শুধু শারীরিক আঘাত বা প্রাণহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে একজন নিরপরাধ মানুষ সামাজিকভাবে অপমানিত হতে পারেন, একটি পরিবার চিরস্থায়ী বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে এবং সমাজে প্রতিশোধের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এতে অপরাধের অভিযোগই অনেক সময় শাস্তি দেওয়ার যথেষ্ট কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ ন্যায়বিচারের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং আইনানুগ সিদ্ধান্ত।
পবিত্র কোরআনে ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে শত্রুতা কিংবা আবেগকে প্রভাব বিস্তার করতে না দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে— ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের কখনো ন্যায়বিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৮)। আয়াতটি স্মরণ করিয়ে দেয়, কোনো ব্যক্তি অপছন্দের হলেও কিংবা তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেও তার প্রতি অন্যায় আচরণ করা বৈধ নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদার নিরাপত্তার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। বিদায় হজের ভাষণে তিনি মুসলমানদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মানকে পবিত্র ঘোষণা করেন। (বুখারি, হাদিস: ৬৭)। এই শিক্ষা মানুষের মর্যাদা রক্ষাকে ইসলামি নৈতিকতার অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। কেউ অপরাধ করে থাকলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে ন্যায়সংগত ও আইনসম্মত পন্থায়; নির্যাতন, অপমান কিংবা প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়।
তাই মব জাস্টিস প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা শুধু ব্যক্তিগত সংযমে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সামাজিক দায়িত্বও যুক্ত। কেউ গুজব ছড়ালে তা যাচাই ছাড়া প্রচার না করা, সহিংসতায় উসকানি না দেওয়া, উত্তেজিত জনতাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করা এবং বিপন্ন ব্যক্তিকে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রত্যক্ষদর্শীরা নিরাপদ উপায়ে তথ্য ও প্রমাণ সংরক্ষণ করে তদন্তে সহযোগিতা করতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযুক্তের পরিচয়, ছবি কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে জনতাকে উত্তেজিত করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় হতে দেখলে সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে; তা না পারলে মুখ দিয়ে, আর তাও না পারলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৯)। অন্যায় প্রতিরোধের এই নির্দেশনাকে এমনভাবে বুঝতে হবে, যাতে প্রতিরোধ করতে গিয়ে আরও বড় অন্যায় বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়। মব জাস্টিস ঠেকানোর অর্থ হলো নির্যাতন বন্ধ করা, সম্ভাব্য ভুক্তভোগীকে রক্ষা করা এবং আইনানুগ কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি পৌঁছে দেওয়া; উত্তেজিত জনতার সঙ্গে সংঘর্ষ বাড়ানো নয়।
এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধের যথাযথ বিচার, আইন প্রয়োগে বৈষম্যহীনতা এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে জনতার হাতে বিচার নেওয়ার প্রবণতা আরও বিস্তৃত হতে থাকবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনকে গুজব প্রতিরোধ, সহনশীলতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে।
ন্যায়বিচারের নামে অন্যায় করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগের মুখে থাকা ব্যক্তির জীবন ও মর্যাদা রক্ষা করাও ন্যায়বিচারের অপরিহার্য শর্ত। জনতার ক্ষোভ কখনো আদালতের বিকল্প হতে পারে না। সত্য যাচাই, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানুষের অধিকার রক্ষার ইসলামি শিক্ষা ব্যক্তি ও
রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হলেই মব জাস্টিসের বিস্তার রোধ করে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



