জাবিতে নারীদের কণ্ঠে সাহসের প্রতিধ্বনি

এই লেখাটি যখন লিখছি তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে একজন শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার ভয়াবহ ঘটনার ১৮ দিন পেরিয়ে গেছে। অভিযুক্ত আততায়ী এখনো অধরা। গত ১৩ মে রাতে সব ছাত্রাবাস থেকে নেমে এসেছিল শিক্ষার্থীরা ধর্ষকামী সেই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার এবং দ্রুত বিচারের দাবি নিয়ে। মধ্যরাত পর্যন্ত চলমান সেই মিছিলে নারী শিক্ষার্থীদের স্লোগানমুখর, স্বতঃস্ফূর্ত ও সরব উপস্থিতি ছিল। সেখান থেকেই ৪৮ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়ে সেই আততায়ীকে ধরার এবং বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার তীব্র দাবি জানানো হয়। কিন্তু কার্যত আমরা দেখলাম এতগুলো দিন পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্ত সেই আততায়ীকে ধরা সম্ভব হয়নি; বরং এরই মধ্যে ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত নারী শিক্ষার্থীসহ অন্যান্য কতিপয় নারী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই প্রকাশ্যে অবমাননা এবং যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছে ক্যাম্পাসের দোকানের কর্মচারী, পার্শ্ববর্তী এলাকাবাসী, এমনকি নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরুষ শিক্ষার্থী দ্বারা। এসব ঘটনার মধ্যে কোনো সূত্র বা পারম্পর্য উদ্ঘাটন প্রচেষ্টা ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করার অধিকার শিক্ষার্থীদের আছে; তবে একজন নারী শিক্ষার্থীর প্রাণনাশের চেষ্টার অব্যবহিত পরই শুধু নয়, ক্যাম্পাসের নারী শিক্ষার্থীদেরকে এসব বিকৃত যৌন অবমাননাকর ভাষায় হেনস্তা করার ঘটনাকে বিগত কয়েক বছরে জনপরিসরের অনলাইন ও বাস্তব উভয় অংশের নারীবিদ্বেষী চর্চার নিগড়ে পাঠ করাই অধিক সংগত।
চব্বিশ-এর অভ্যুত্থানের কিছুদিন পরই ক্যাম্পাসে দায়িত্ব গ্রহণ করে বর্তমান প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপদ্ধতির সার্বিক মান বৃদ্ধি, উন্মুক্ত বাক্ ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের বৈষম্যহীন নিরাপত্তা প্রদানের প্রত্যাশা— এই প্রশাসনের কাছেই ছিল শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে। গণরুমের বিলুপ্তি, শিক্ষার্থীদের পূর্ণ আবাসন নিশ্চিতকরণ, অটোমেশন পদ্ধতির কার্যকর উদ্যোগসহ বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ ও সাফল্য রয়েছে এই প্রশাসনের। কিন্তু কিছু মৃত্যু ও কিছু নিপীড়নের বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়; যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বিশেষত নারী শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হয়ে উঠেছে বিগত দেড় বছরে।
সম্প্রতি কন্যাশিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা আমাদের সমাজের গভীর বিকৃতি ও নারীবিদ্বেষী পরিচয়বাদী ভাবাদর্শিক শক্তির আস্ফালনকেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে
লাইসেন্সবিহীন অটোরিকশার ধাক্কায় প্রথম বর্ষের নবাগত শিক্ষার্থীর মৃত্যু, জাকসু নির্বাচন চলাকালে মেডিকেল অব্যবস্থাপনায় দায়িত্বরত শিক্ষকের মৃত্যুর মতো ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অংশীজনেরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ ছিলই। ‘মাদকের ত্রাস’ বলে খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মহোদয়ের সময়কালে শিক্ষার্থী সংসদ প্রতিনিধি নির্বাচনে আগে প্রার্থীদের ডোপ টেস্টের ফলাফলটিও চেপে যাওয়া হয় সুকৌশলে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকায় বসবাসরত এক নারী শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়েরই সাবেক এক শিক্ষার্থী, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ছাত্রনেতা কর্তৃক ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। সুস্পষ্ট আলামত ও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত সেই ছাত্রনেতাকে গ্রেপ্তারে সহযোগিতায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি প্রশাসনকে। বরং ভুক্তভোগী নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে অভিযুক্ত ছাত্রনেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ফাঁস করা ছবিসম্বলিত নথি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার ও তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে ভুক্তভোগীকে মোরাল পুলিশিং এবং মিডিয়া ট্রায়ালের সম্মুখীন করে কিছু সাংবাদিক; এ বিষয়ে প্রশাসন ছিল নীরব। একই এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আরেক নারী শিক্ষার্থী মৃত্যুবরণ করেন, অভিযোগ আছে তিনি পারিবারিক কলহের জেরে স্বামীর হাতে খুন হন। কিন্তু এ বিষয়েও সেই শিক্ষার্থীর পরিবার বা তার সহপাঠীরা বিচারিকপ্রক্রিয়ায় প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি প্রশাসনের কাছ থেকে।
সর্বশেষ ১২ মে রাতে এক নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টা ঘটনার পর আন্দোলনরত নারী শিক্ষার্থীরা প্রক্টরিয়াল বডির সমক্ষে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করার সময় যখন মনিটরে ভুক্তভোগী নারীর আর্তচিৎকার ভেসে আসছিল, তখন এই স্পষ্ট শব্দ শুনতে পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে প্রক্টর মহোদয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসি ক্যামেরার যান্ত্রিক সক্ষমতার প্রশংসা করেন অপ্রাসঙ্গিকভাবে। স্বভাবতই তার এই অসংবেদনশীল মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এর পরপরই ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত ও সাধারণ নারী শিক্ষার্থীদের অবমাননা ও যৌন হেনস্তার আরও বেশ কয়েকটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্গিরণে প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগের দাবিটি উঠে আসে। আন্দোলনকারীদের যে অংশটি থেকে দাবিটি উঠে আসে, তাদের ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে অভিহিত করেন স্বয়ং প্রক্টর। তার দাবি, এখানে বাম মতাদর্শিক শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য বেশি রয়েছে। এখানে অবশ্যই বিতর্কের অবকাশ রয়েছে যে, এই প্রক্টরিয়াল বডির অপসারণ হলেই সেই হত্যাচেষ্টাকারী আততায়ী ধরা পড়বে কি না, নাকি এতে গ্রেপ্তার ও বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হবে এবং ভুক্তভোগী নারীর বিচার না পাওয়ার সম্ভাবনাই প্রকট হবে। তবে সারা দেশে লাগাতার ধর্ষণের বীভৎস সব খবরের মধ্যে এখন যেখানে ক্যাম্পাসেই একজন নারী লাঞ্ছনাসহ হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হলেন, তখন আন্দোলনের একটি অংশকে কেবল ‘বাম’ ট্যাগ দিয়ে সংকুচিত করা নিঃসন্দেহে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিবাদী সব সাধারণ শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে আসামিকে গ্রেপ্তর, বিচার ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা বৃদ্ধির ন্যায্য দাবিকেই প্রশ্নবিদ্ধ ও উপেক্ষা করার শামিল। স্মর্তব্য, বিগত আওয়ামী রেজিমে স্বৈরাচারবিরোধী দেয়াল লিখন কিংবা আনুষঙ্গিক প্রতিবাদের জেরে বাম রাজনৈতিক শিক্ষার্থী সংগঠনের একাংশের প্রতিনিধিদের বহিষ্কারসহ নানা অবদমনের ইতিহাসও রয়েছে ক্যাম্পাসে। এ কথাও ঠিক, চলমান আন্দোলনে, এই বাম ফ্রেমিংয়ের প্রতিবাদে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা প্রক্টর মহোদয়কে উদ্দেশ্য করে অশ্রাব্য শব্দচয়ন এবং ক্যাম্পাসের সাংবাদিকদের অবমাননাকর সম্বোধন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতি ও প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে তাদেরকে এহেন বিষোদগারের তদন্ত ও শাস্তিও দাবি করা হয়েছে উপাচার্যের কাছে। কিন্তু নারী শিক্ষার্থী লাঞ্ছনার বিবিধ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যর্থ হলেও সাংবাদিক সমিতির দাবিতে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের সম্ভাবনাই প্রকট। কেননা সাংবাদিক সমিতি ও প্রেস ক্লাবের যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরপেক্ষ দর্পণ হয়ে ওঠার কথা, সেখানে এই গোষ্ঠীদ্বয় হয়ে উঠেছে প্রশাসনের কণ্ঠস্বর।
বিভাজিত আন্দোলনের জেরে আমরা এরই মধ্যে ‘নারী নিরাপত্তা মঞ্চ’ এবং ‘নিরাপদ ক্যাম্পাস আন্দোলন’ নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের নারীদের উদ্যোগে দুটি ভিন্ন প্ল্যাটফর্মের উত্থান হতে দেখি। দুটি পক্ষই এ ঘটনার দ্রুত ও সঠিক বিচার দাবি করে। তবে মোদ্দাকথা হলো, দেশের পুলিশ, র্যাব, আর্মিসহ গোয়েন্দা বিভাগ, ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের কোনো তরফ থেকেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি।
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, আন্দোলনের এই বিভাজন আমাদেরকে মূলত জুলাইয়ের পর অভ্যুত্থানের মূল নেতৃত্ব কার, এই কর্তৃত্ব দাবির প্রশ্নে বিভাজন এবং তার জেরে নারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা উদারপন্থী শক্তিকে প্রান্তিকীকরণের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যে নতুন বাংলাদেশের প্রত্যয়ে অভ্যুত্থানের পর পুনর্গঠন ও বিনির্মাণের আশা জেগে উঠেছিল, তা আমরা অচিরেই চূর্ণবিচূর্ণ হতে দেখেছি নির্বাচনের পূর্বাপর সময়ে। সম্প্রতি কন্যাশিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা আমাদের সমাজের গভীর বিকৃতি ও নারীবিদ্বেষী পরিচয়বাদী ভাবাদর্শিক শক্তির আস্ফালনকেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে নির্মিত অজস্র গুপ্ত অ্যাডমিনের অনলাইন সোশ্যাল মিডিয়া পেজ ও ক্যাম্পাসভিত্তিক অনলাইনপোর্টাল একাগ্র অভিনিবেশে এই নারীবিদ্বেষী মনস্তত্ত্বের প্রসার ঘটিয়ে চলেছে তাদের ক্লিক বেইট বাণিজ্যের চাতুরীতে। এই চর্চা আমাদের কোন পথে নিয়ে যাবে আসলে?
অবশ্য সব শঙ্কাকে মুলতবি রেখেও বলা যায়, কাঁকন বিবি কিংবা তারামন বিবির সাহসের এই বাংলাদেশে খুব অনায়াসসাধ্য হবে না এসব অবদমন। ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিবাদে ১৯৯৮ থেকে ২০২৬, জাহাঙ্গীরনগরের মুক্তিকামী নারীদের কণ্ঠস্বরে তো সে সাহসেরই প্রতিধ্বনি শুনি!
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, চারুকলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়







