ইলিশ রক্ষায় জরুরি যৌথ পাহারা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রতি বছর আশ্বিনের পূর্ণিমা-অমাবস্যা ঘিরে একই দৃশ্য দেখা যায়। নদীতে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা, মাইকিং, স্পিডবোটের ছোটাছুটি, জাল পোড়ানোর আগুন আর ভ্রাম্যমাণ আদালতের রায়। ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় চলছে এবারও সেই প্রস্তুতি। কিন্তু বছর বছর একই অভিযানের পরও ইলিশ কেন কমছে— সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। আমার বিশ্বাস, উত্তরটি লুকিয়ে আছে নিষেধাজ্ঞা চর্চার ফাঁকে। সরকার একা পাহারা দিচ্ছে আর জনতা দাঁড়িয়ে আছে দর্শকের সারিতে।
পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার টন ইলিশ আহরিত হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে নামে আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নামে ৫ লাখ টনে। দুই বছরে ঘাটতি ৭১ হাজার টন।
সমুদ্রের অবস্থা আরও খারাপ। ২০২১-২২ অর্থবছরে সমুদ্র থেকে প্রায় ৩ লাখ ২২ হাজার টন ইলিশ এসেছিল, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসেছে প্রায় ২ লাখ ৫১ হাজার টন। তিন বছরে পতন প্রায় ২২ শতাংশ। এ সময়েই ইলিশ উন্নয়নে ২২৯ কোটি টাকার একটি পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্প চলেছে, অর্থাৎ বরাদ্দ ও অভিযান দুটোই ছিল, তবু ফল আসেনি। এর মানে শুধু সরকারি উদ্যোগে আর কাজ হচ্ছে না।
সরকারের একার পক্ষে এই পাহারা কেন সম্ভব নয়, তা বোঝা কঠিন নয়। গত বছরের নিষেধাজ্ঞায় ৩৭টি জেলার ১৬৫টি উপজেলার ৬ লাখ ২০ হাজারের বেশি জেলে পরিবারকে খাদ্য-সহায়তার আওতায় আনা হয়েছিল, যাতে প্রয়োজন হয়েছিল ১৫ হাজার ৫০০ টনের বেশি চাল। এত বিস্তীর্ণ জলসীমা, অসংখ্য চর, খাল আর শাখা নদী দিন-রাত পাহারা দেওয়ার মতো জনবল ও নৌযান মৎস্য অধিদপ্তরের নেই। নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনী টহল দেয় ঠিকই; কিন্তু টহল চলে গেলেই অন্ধকারে জাল নামে। পটুয়াখালী ও বরগুনায় কঠোর অভিযানের মধ্যেও রাতে ইলিশ ধরার খবর এসেছে। চাঁদপুরে এক রাতের অভিযানেই ৫০ লাখ মিটার কারেন্ট জাল জব্দ হওয়ার ঘটনাও বলে দেয়, নদীতে অবৈধ জালের পরিমাণ কত বিশাল।
জনতা যখন পাহারায় যুক্ত হয়, তখন ফল আসে। এর প্রমাণ আমাদের অভিজ্ঞতাতেই আছে
অন্যদিকে জনতা যখন পাহারায় যুক্ত হয়, তখন ফল আসে। এর প্রমাণ আমাদের অভিজ্ঞতাতেই আছে। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মৎস্য অধিদপ্তর ও ওয়ার্ল্ডফিশের যৌথ ইকোফিশ প্রকল্পে অভয়াশ্রমসংলগ্ন ১৩৬টি জেলে গ্রামে সহব্যবস্থাপনা চালু হয়েছিল। গঠিত হয়েছিল ৫৭৫টি ইলিশ সংরক্ষণ দল। আর প্রায় ৪০০ প্রশিক্ষিত কমিউনিটি ফিশ গার্ড নদী পাহারায় যুক্ত ছিলেন। প্রকল্পের শেষ চার বছর টানা ইলিশের বাম্পার উৎপাদন হয়েছিল। সরকারি কাঠামো আর জনগণের অংশগ্রহণ যখন এক হয়েছিল, ইলিশ তখন ফিরে এসেছিল। প্রকল্প শেষে সেই যৌথ কাঠামো ধরে রাখা যায়নি। আর তার মাশুল আমরা এখন দিচ্ছি।
যৌথ পাহারা মানে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া। সরকারের দিক থেকে প্রথমত, নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর নৌযান, জ্বালানি ও জনবল বাড়িয়ে টহলকে সারা বছরের কাজে পরিণত করতে হবে। মৎস্য অধিদপ্তর থাকবে কারিগরি দিকনির্দেশনা ও তথ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে। দ্বিতীয়ত, ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকার-জনতার যৌথ ইলিশ সংরক্ষণ কমিটি গঠন করতে হবে। এতে ইউনিয়ন পরিষদ, মৎস্য কর্মকর্তা, নৌ পুলিশ, জেলে প্রতিনিধি, শিক্ষক ও তরুণরা একসঙ্গে বসবেন। তৃতীয়ত, একটি জাতীয় হটলাইন চালু করতে হবে, যেখানে খবর দিলে দ্রুত অভিযান হবে এবং তথ্যদাতার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন থাকবে। চতুর্থত, খাদ্য-সহায়তা নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই প্রকৃত জেলের হাতে পৌঁছাতে হবে। কারণ, ক্ষুধার্ত মানুষকে আইন মানানো যায় না, তার আস্থাও অর্জন করা যায় না। পঞ্চমত, অবৈধ জালের কারখানা ও গুদামে অভিযান চালাতে হবে, যাতে জাল নদীতে নামার আগেই থামে।
জনতার দিক থেকেও দায় কম নয়। জেলেদের নিজেদের বুঝতে হবে, আজ যে মা ইলিশটি রক্ষা পাবে, কাল সেটিই অসংখ্য ইলিশ হয়ে তার জালে ফিরবে। প্রতিটি ঘাটে জেলেদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী পাহারা দল গড়ে উঠতে পারে, যারা সেই দুর্গম চরে নজর রাখবে, যেখানে প্রশাসনের নৌযান পৌঁছায় না। ঘাটের মানুষ জানেন, কোন নৌকা রাতে নামে আর কোন আড়তে মাছ যায়। সেই তথ্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হবে তাদের বড় অবদান।
শহরের ক্রেতারও দায় আছে। নিষেধাজ্ঞার সময় গোপনে বিক্রি হওয়া ডিমওয়ালা ইলিশ না কিনলে শিকারের বাজারই ভেঙে পড়বে। শিক্ষার্থী, মসজিদের ইমাম ও স্থানীয় গণমাধ্যম সচেতনতা ছড়াতে পারে, যাতে মা ইলিশ ধরা সমাজের চোখেও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
‘অবৈধ জাল বন্ধ করো, মৎস্যসম্পদ রক্ষা করো’ স্লোগান নিয়ে নাগরিক উদ্যোগে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, মানুষ এগিয়ে আসতে চায়। তাদের দরকার একটি কাঠামো, প্রশাসনের আস্থা আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। সরকার যদি জনতাকে প্রতিপক্ষ নয়, অংশীদার হিসেবে দেখে, তবে নদী পাহারার জন্য লাখো চোখ পাওয়া যাবে।
ইলিশ কোনো একক সংস্থার সম্পদ নয়; এটি জাতির সম্পদ। সরকারের আইন আর জনতার পাহারা যখন একসঙ্গে চলবে, তখনই নদীতে অবৈধ জাল থামবে, মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়বে আর ইলিশের সুদিন ফিরবে। এবারের ২২ দিন হোক সেই যৌথ পাহারার সূচনা।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান অ্যাকুয়াকালচার বিভাগ, শেকৃবি



