আমাদের প্লেজার ট্রিপ ও হাওরবাসীর অধিকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আষাঢ় ও শ্রাবণ এলেই বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল এক ভিন্ন ভূখণ্ডে পরিণত হয়। চারদিকে অথৈ জল, ডুবে যায় সড়ক, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গ্রাম। নৌকাই তখন একমাত্র ভরসা। দূর থেকে এই জলরাশি মনোমুগ্ধকর মনে হলেও হাওরবাসীর কাছে বর্ষা প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি টিকে থাকার এক কঠিন লড়াই।
প্রায়ই
বলা হয়, হাওরের মানুষ
তো যুগ যুগ ধরে
এমন পরিবেশেই বসবাস করছে। তাদের জন্য আবার আলাদা
নীতি কেন? এই যুক্তি
বাস্তবতাকে আড়াল করে। মানুষ প্রতিকূল
পরিবেশে টিকে থাকতে পারে
বলেই রাষ্ট্র তার দায়িত্ব থেকে
মুক্ত হয়ে যায় না।
অভিযোজন উন্নয়নের বিকল্প নয়; বরং যে
অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা আলাদা, সেখানে একই উন্নয়ন নীতি
প্রয়োগ করাই বৈষম্যের
আরেক নাম।
বর্ষাকালে হাওরের সবচেয়ে বড় আঘাত আসে জীবিকায়। বোরো ধান ঘরে তোলার পর বহু পরিবারের নিয়মিত আয়ের পথ সংকুচিত হয়ে যায়। কৃষি, মাছ ধরা, দিনমজুরি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল মানুষ বৈরী আবহাওয়া, ঝড়, প্রবল ঢেউ এবং জলপথের ঝুঁকির কারণে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেন না। একই সময়ে নৌপথে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামও বাড়ে। অর্থাৎ আয় কমে, ব্যয় বাড়ে। এই দ্বিমুখী চাপ দরিদ্র পরিবারগুলোকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। মৌসুমি বেকারত্বের কারণে অনেক তরুণ শহরমুখী হন, যা শুধু একটি পরিবারের নয়; পুরো হাওরাঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোই দুর্বল করে।
শিক্ষা খাতেও বর্ষা এক কঠিন বাস্তবতা তৈরি করে। বহু শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে যেতে নৌকায় দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। প্রবল বাতাস, বজ্রপাত কিংবা উত্তাল ঢেউয়ের কারণে অভিভাবকরা সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে ভয় পান। ফলে উপস্থিতি কমে, শিক্ষার ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কন্যাশিশুরা। আমরা যখন আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষার কথা বলি, তখন মনে রাখতে হবে, অনেক হাওর এলাকায় এখনো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত সুবিধাই নিশ্চিত হয়নি। তাই সারা দেশের জন্য একধরনের শিক্ষা মডেল কার্যকর হবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। ভাসমান বিদ্যালয়, আবাসিক শিক্ষা, মৌসুমি শিক্ষা ক্যালেন্ডার এবং ডিজিটাল লার্নিং সেন্টারের মতো উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়; রাষ্ট্রের নিয়মিত নীতির অংশ করতে হবে।
সমতা মানে সবার জন্য একই ব্যবস্থা নয়; বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। তাই হাওরবাসীর জন্য বিশেষ উদ্যোগ কোনো অনুগ্রহ নয়, সংবিধানসম্মত দায়িত্ব
সবচেয়ে নির্মম চিত্রটি দেখা যায় স্বাস্থ্যসেবায়। বর্ষার রাতে কোনো অন্তঃসত্ত্বা নারীর প্রসববেদনা উঠলে কিংবা সাপে কাটা রোগীকে হাসপাতালে নিতে হলে শুরু হয় সময়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। অনেক ক্ষেত্রে নৌকা জোগাড় করতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগ, সাপের কামড় ও বজ্রপাতে মৃত্যুর ঝুঁকিও বর্ষায় বেড়ে যায়। অথচ এ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। প্রত্যন্ত হাওরে বড় হাসপাতাল নির্মাণ সবসময় সম্ভব না হলেও জলপথে অ্যাম্বুলেন্স, ভাসমান হাসপাতাল, টেলিমেডিসিন এবং মৌসুমি মেডিকেল টিম গড়ে তোলা মোটেই অসম্ভব নয়। প্রশ্ন প্রযুক্তির নয়, অগ্রাধিকারের।
এমন বাস্তবতায় পর্যটনকে অনেকেই আশার আলো হিসেবে দেখেন। বর্ষাকালে টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি, শনির হাওর কিংবা অন্যান্য জলাভূমিতে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অর্থনৈতিক প্রবাহের কতটা স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় হয়? বাস্তবতা বলছে, পর্যটনের লাভ সীমিত কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হলেও পরিবেশগত ক্ষতির বোঝা বহন করে পুরো হাওর। প্রতিদিন জমছে প্লাস্টিক বর্জ্য, বাড়ছে শব্দদূষণ, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাখি, মাছ ও জলজ বাস্তুতন্ত্র। পর্যটনের নামে যদি হাওরের প্রকৃতিই বিপন্ন হয়, তবে দীর্ঘ মেয়াদে সেই ক্ষতি পর্যটনশিল্পকেও আঘাত করবে।
তাই হাওরে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ‘হাউসবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হোয়াব)’, স্থানীয় পর্যটন ট্রলার মালিক সমিতি এবং ডে-ট্রিপ বোট মালিকদের সংগঠনগুলোর ভূমিকা শুধু ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। হাওরের প্রকৃতি ও মানুষের জীবনই তাদের ব্যবসার ভিত্তি। ফলে পরিবেশ সংরক্ষণে তাদের নেতৃত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে স্থানীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষা-সহায়তা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, স্বাস্থ্যশিবির, ভাসমান চিকিৎসাসেবা কিংবা জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নৌযান সহায়তার মতো উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
হাওরকে শুধু একটি জলাভূমি হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এটি একটি স্বতন্ত্র জীবনব্যবস্থা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ধারক। এখানকার কৃষি, মৎস্যসম্পদ, লোকসংস্কৃতি এবং মানুষের জীবন প্রকৃতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। উন্নয়নের অর্থ মানুষকে তার ভূগোল থেকে সরিয়ে নেওয়া নয়; বরং সেই ভূগোলের মধ্যেই নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় জীবন নিশ্চিত করা।
হাওরাঞ্চলের জন্য পৃথক মৌসুমি উন্নয়ন পরিকল্পনা, জীবিকা সুরক্ষায় শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, নিরাপদ শিক্ষাব্যবস্থা, জলপথভিত্তিক জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি সংস্থা, পর্যটন খাতের সংগঠন এবং স্থানীয় জনগণকে সমন্বিত অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।
সমতা
মানে সবার জন্য একই
ব্যবস্থা নয়; বাস্তব প্রয়োজন
অনুযায়ী সমান সুযোগ নিশ্চিত
করা। তাই হাওরবাসীর জন্য
বিশেষ উদ্যোগ কোনো অনুগ্রহ নয়,
সংবিধানসম্মত দায়িত্ব। হাওরের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করতে জানে। এখন
রাষ্ট্র, সমাজ এবং হাওরভিত্তিক
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দায়িত্ব সেই লড়াইকে আরও
নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই করে
তোলা।
লেখক:
কবি, প্রাবন্ধিক ও অধিকারকর্মী




