বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ বৈঠকে কী পেল বাংলাদেশ

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত কনভেনশন সেন্টারে সদ্যসমাপ্ত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভা শুধু কিছু আর্থিক হিসাবনিকাশের দালিলিক বৈঠক ছিল না। সেখানে দীর্ঘদিনের জটবন্দি আর্থিক খাতের সঠিক সংস্কারের কৌশল পথ তুলে ধরেছে বাংলাদেশ। দাতা সংস্থাগুলোর টেবিলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে বার্তা উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে বলা হচ্ছে— অনুদান বা ঋণপ্রার্থী দেশ থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগমুখী হতে চায়। আর এজন্য কাঠামোগত সংস্কারে বাংলাদেশ দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নিরিখে অর্থনৈতিক চাকা ঘোরানোর এ প্রতিশ্রুতিতে অনেকটা সন্তোষ প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি থেকে শুরু করে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগও।
সরকারের সংশ্লিষ্টদের মতে, ঋণ বা সহায়তার অঙ্কের চেয়েও বড় কথা, বিশ্বমঞ্চে হারানো সেই ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ ও আস্থার আসনটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ, যা আগামী দিনের টেকসই অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।
১৯১টি দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এবং বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে গত ১২-১৮ অক্টোবর বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা শেষ হয়েছে।
বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রে একদিকে ছিল মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘায়িত ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি ও এলএনজির চড়া দাম এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অস্থিরতা। অন্যদিকে, এআই বিপ্লব ও উদীয়মান অর্থনীতির নতুন মেরূকরণ— সব মিলিয়ে এবারের বার্ষিক সভাটি ছিল বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জের মঞ্চ। বৈঠকে অাগামী ১৫ বছরে বিশ্বে ১২০ কোটি কর্মসংস্থানের বিপরীতে মাত্র ৪০ লাখ পূরণ হবে, বাকি ৮০ কোটি থাকবে বেকার— এমন পরিসংখ্যান তুলে সংকট ও সংশয় প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক।
এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সম্মেলন থেকে বাংলাদেশ কী পেল, সেটাই বড় প্রশ্ন। সম্মেলনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হলো বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে রুটিন সহায়তার বাইরে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে সবুজ সংকেত পেয়েছে বাংলাদেশ। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের নতুন ‘কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক’ বা অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে রিজার্ভের ওপর চাপ কমানো এবং জ্বালানি, সারের বাণিজ্য অর্থায়নসহ বিভিন্ন কৌশলগত খাতে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
দেশের বিশাল অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের জালে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের কারিগরি সহায়তা উইংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পার্টনারশিপের চূড়ান্ত সম্মতি মিলেছে। এর ফলে ঋণ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, বার্ষিক ঋণ গ্রহণ পরিকল্পনা এবং নগদ অর্থের আগমন-বহির্গমনের আগাম পূর্বাভাস পাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে, যা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের সুরক্ষাবলয় দেবে।
বিগত সরকারের আমলের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং অব্যবস্থাপনার অধ্যায় পেরিয়ে বর্তমান সরকার যেভাবে অর্থনীতি পরিচালনা করছে, তার প্রশংসা করেছে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি ও মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ।
বৈঠকে আইএমএফের ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তিন বছর মেয়াদি নতুন ঋণ কর্মসূচি এবং সংস্কারের শর্তগুলো একসঙ্গে চাপিয়ে না দিয়ে বরং পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে নতুন আরও ঋণ পেতে যাচ্ছে। অবশ্য বিগত সরকার আইএমএফ থেকে েয ঋণ করেছিল. সেটি বাতিল করা হয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্টদের মতে, ঋণ বা সহায়তার অঙ্কের চেয়েও বড় কথা, বিশ্বমঞ্চে হারানো সেই ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ ও আস্থার আসনটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ, যা আগামী দিনের টেকসই অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে
বাংলাদেশের অঙ্গীকার
ব্যাংকক সম্মেলনের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সাইডলাইন বৈঠক এবং প্লেনারি সেশনে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্ববাসীর সামনে কিছু সুনির্দিষ্ট ও সংস্কার এজেন্ডা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথাগত ও ঝুঁকিপূর্ণ সার্বভৌম ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এবং ইকুইটি ইনভেস্টমেন্টের ওপর জোর দেবে বাংলাদেশ— এমন ঘোষণা দেওয়া হয়। বিশেষ করে চীনা এক্সিম ব্যাংকের সহযোগিতায় যৌথ বিনিয়োগ এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন প্যাকেজ চালুর অঙ্গীকার করা হয়েছে।
এ ছাড়া অতীতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি ও প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচনে ত্রুটি। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচিগুলোতে শতভাগ ডিজিটাল জনপরিকাঠামো ব্যবহারের অঙ্গীকার করেছে সরকার। স্বাধীন গবেষণার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, ফ্যামিলি কার্ডের সঠিক বাস্তবায়নে দেশের দারিদ্র্য প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাবে।
পাশাপাশি হার না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আহরণের দায়িত্ব আলাদা করার মাধ্যমে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কর আহরণ জিডিপির ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
আর ব্যাংকিং খাতে অতীতে ঘটে যাওয়া অনিশ্চয়তা ও অর্থ লুটপাটের ক্ষত সারাতে সময়সীমা ভিত্তিক কঠোর সংস্কারের অঙ্গীকার করা হয়েছে। খেলাপি ঋণ হ্রাস, দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি পুনর্গঠন এবং আমানতকারীদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা রক্ষায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়েছে। সেখানে উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত উত্তোলনের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি এর বড় প্রমাণ।
দাতা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে বাংলাদেশ
বৈঠকে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এবং কিছু ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা সংবলিত মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। আইএমএফের হিসাবে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ হয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশের ঘরে থাকতে পারে এবং বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশের চাপে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। সংস্থাটি মনে করে, এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামলাতে শুধু কঠোর মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়, বরং সমন্বিত রাজস্ব ও আর্থিক সংস্কার অপরিহার্য।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের নীতিনির্ধারকরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশের আর্থিক খাত দীর্ঘকাল ধরে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে আমদানিকৃত জ্বালানি ও এলএনজির চড়া দাম অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। তাই ঢালাও ভর্তুকি না দিয়ে তা আরও লক্ষ্যভিত্তিক করার তাগিদ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া বৈশ্বিক এই সংকটকালে নির্দিষ্ট কিছু অনুৎপাদনশীল খাতের চেয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো মানবসম্পদ উন্নয়নমূলক খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষ থেকে জোরালো পরামর্শ এসেছে। মার্কিন ট্রেজারির সহায়তায় ঋণ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন দ্রুত কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি মিলছে।
বাংলাদেশের জন্য এক যুগসন্ধিক্ষণে ব্যাংকক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একদিকে ভঙ্গুর অর্থনীতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা ও নতুন সহায়তার সম্ভাবনা— এ দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। সরকার যদি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সুনির্দিষ্ট পরামর্শগুলো আমলে নিয়ে নিজস্ব সংস্কার এজেন্ডা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশ এক টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারবে।
লেখক: বিজনেস এডিটর, আগামীর সময়




