নিরাপত্তাহীনতার শেষ কোথায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাসহ সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি জনমনে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। হত্যা, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও ধর্ষণের মতো অপরাধের পাশাপাশি ‘কিশোর গ্যাং’ ও ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনির মতো ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। জননিরাপত্তার বিষয়টি আজ এমন এক পর্যায়ে ঠেকেছে, সাধারণ মানুষ পথঘাট ছাড়াও নিজেদের বাসাবাড়ি কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও নিরাপদ বোধ করছেন না। স্থলভাগের পাশাপাশি সুন্দরবনসহ নৌপথগুলোতেও জলদস্যুদের উৎপাত বেড়েছে; জেলেদের মাছ, অর্থ ও সামগ্রী লুটে নেওয়ার ঘটনা নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নাগরিক জীবনে একধরনের তীব্র নিরাপত্তাহীনতা জেঁকে বসেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আজও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদকের বেপরোয়া ব্যবসা। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিতর্কিতভাবে জামিন পাওয়া দাগি অপরাধীরা পুরনো অপরাধ চক্রে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।
সড়ক বা মহাসড়কে যানবাহন থামিয়ে অভিনব কায়দায় ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও তা প্রতিরোধে পুলিশের কার্যকর তৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে না। মাঠ পর্যায়ের এই চরম অবনতিশীল চিত্র সত্ত্বেও নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা সত্যিই হতাশাজনক।
অপরাধী যে দলের বা মতেরই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে
দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার শরিফ, পীরের আস্তানা, বাউল আখড়ায় হামলা, ভাঙচুর ও সহিংসতার ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে আসে হরহামেশা। এসব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সর্বশেষ ঢাকার মিরপুরে শাহ আলীর মাজারে দুর্বৃত্তদের হামলার ঘটনাটি আমাদের সমাজকে নাড়া দিয়ে গেছে। এই ‘মব’ সংস্কৃতির ধারকরা দেশের দীর্ঘদিনের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং পারস্পরিক সহাবস্থানের ওপর আঘাত হানছে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তা অপরাধীদের আরও উসকে দিচ্ছে।
এটি অনস্বীকার্য যে, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনীর মনোবল মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছিল। সেই ধাক্কা সামলে ওঠার চেষ্টা চললেও পুলিশকে এখনো পুরোপুরি চাঙ্গা ও শতভাগ কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এই সুযোগে অপরাধীরা এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তোয়াক্কা করছে না, এমনকি মাঠ পর্যায়ে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের ওপর চড়াও হতেও দ্বিধা করছে না।
অপরাধী যে দলের বা মতেরই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। যারা পুলিশের ওপর হামলা চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই ধারাবাহিক অবনতি ও চলমান সংকট থেকে উত্তরণে সরকারকে অতিদ্রুত আত্মপর্যালোচনা করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিটি সংস্থাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নাগরিকের অমূল্য জীবনের সুরক্ষার প্রশ্নে কোনো অজুহাতই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
রাজধানীসহ সারা দেশে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি এবং পুলিশের টহল জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই। সরকারের সদিচ্ছা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং জনগণের সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমেই কেবল সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মব ভায়োলেন্স ও অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধ করে একটি নিরাপদ ও শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট, গেন্ডারিয়া ঢাকা




