আমেরিকা-চীন দ্বন্দ্বে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চীনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান যে ভৌগোলিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে আমেরিকার সঙ্গে চীনের যে একটা দ্বন্দ্ব, যেটা আমেরিকারই তৈরি করা; সেই দ্বন্দ্বের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব বহন করে। তবে সফরে যে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত (এমওইউ) হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করার বিষয় রয়েছে। কারণ, এমওইউ সই করা এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করার মধ্যে একটা বিরাট গ্যাপ থাকে। এটা এখন নির্ভর করবে বাংলাদেশের ওপরই।
চীন যে যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে বাংলাদেশকে দেখছে, সেটার প্রমাণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর চীনা প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার ‘ওয়ান-টু-ওয়ান’ বৈঠক। তবে বাংলােদশ কী পদক্ষেপ নেয়, সেটার জন্য সে অপেক্ষা করতে হবে। কোনো সন্দেহ নেই, সুযোগ তৈরি হয়েছে। কারণ আমার মনে হয়— শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের সময়ই বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারটা আরও ভালোভাবে আলোচনা হয়েছে। এখন দেখা দরকার, এর ইমপ্লিমেনটেশন (বাস্তবায়ন)। কারণ, ওই করিডরের সঙ্গে জড়িত আবার রোহিঙ্গার বিষয়টি। চীন বরাবরই বলে এসেছিল, সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে বা এর মূল কারণ খুঁজে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়টি সমাধান করতে হবে। এখন যদি ইকোনমিক করিডর করতে হয়, স্বাভাবিকভাবেই আরাকানের মাধ্যমেই তা করা সম্ভব। তার মানে হচ্ছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটা সমাধানে আসা। যেহেতু চীনের থেকে করিডরের প্রস্তাবটা এসেছে, সে জায়গায় একটা বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন দেখা দরকার, বাংলাদেশ সরকার এটা কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে?
দুদেশের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে যে এমওইউগুলো সই করা হয়েছে বা যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে— যার মধ্যে ইকোনমিক করিডর ছাড়াও তিস্তা প্রকল্পে চীনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। যদিও এটি (তিস্তা প্রকল্প) নতুন নয়, আগেও ছিল। এখন নির্ভর করছে বাংলাদেশ কীভাবে এগুলোকে বাস্তবে রূপ দেবে। এর একটা বড় কারণ হচ্ছে, ভূরাজনীতিতে যেহেতু আমেরিকার সঙ্গে চীনের এখন একটা বড় দ্বন্দ্ব চলছে, সেখানে চীন স্বাভাবিকভাবে দেখতে চাচ্ছে—বাংলাদেশ কী করে। বৈঠকের পর যেটা প্রকাশ পেয়েছে সেখানে আমরা েয ক্লসগুলো (দফা) দেখলাম, তার মধ্যে দুটি ক্লস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটা হলো, টু প্লাস টু। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীন পরিষ্কার করে দিচ্ছে, তারা কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তার কাঠামো তৈরি করবে না; বরং প্রয়োজনে সবার সঙ্গেই কিংবা যেসব দেশ চাচ্ছে, তাদের নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করবে। আমেরিকা যেভাবে চাচ্ছে, সেটা যদি আমেরিকাকে সেভাবে দেওয়া হয়, ঠিক একই ধরনের সুযোগ-সুিবধা চীনকেও দেওয়া হবে। সে রকম একটা ক্লস আমরা দেখছি এই ‘টু প্লাস টু’-এর মাধ্যমে।
আরেকটা ক্লস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হলো, তাইওয়ানকে নিয়ে যে আলোচনা— সেখানে বাংলাদেশ অঙ্গীকার করেছে, ‘ওয়ান চায়না পলিসি’। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের বড় একটা ফরেন পলিসির স্ট্র্যাটেজির মধ্যে তাইওয়ানকে সাপোর্ট করার বিষয়টি আছে এবং চীনের বিপক্ষের শক্তিকে যত বড় করা যায়, সেখানে বাংলাদেশ পরিষ্কার করে দিয়েছে— তারা ‘এক চায়না নীতি’র পক্ষে এবং জোরালোভাবেই এ ক্লসটা এসেছে। তাতে বোঝা যাচ্ছে, বাংলােদশের বর্তমান সরকার সে ধরনের একটা আভাস দিচ্ছে যে, তারা সবার সঙ্গেই সম্পর্ক রাখবে এবং এখানে চীনের সঙ্গেও একটা বড় সম্পর্ক রাখবে। এখন দেখা দরকার, যুক্তরাষ্ট্র এটাকে কীভাবে দেখে। কারণ, এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে অ্যাগ্রিমেন্ট হয়েছে, সেটা নিয়ে ঘরের ভেতরে যথেষ্ট সমালোচনা শুরু হয়েছে এবং সেটা যেহেতু নির্বাচনের (ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন) তিন দিন আগে করা হয়েছে, যেটা কোনো দেশেই করা হয় না। তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনকালীন সরকার কোনো বড় ধরনের চুক্তিতে যেতে পারে না; সেটা বাংলাদেশের ব্যাপারে তো নয়-ই, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কোনো দেশেই এটি করা যায় না। তারপরও সেটা যেহেতু করা হলো, সেটার হয়তো রাজনৈতিক একটা কারণ আছে, প্রেশার থাকতে পারে ইত্যাদি। কিন্তু করাটা যে একেবারে আইনের বাইরে, সেটা পরিষ্কার।
এখন যেহেতু এটা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, এমনকি আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টও সেই ট্যারিফের বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে। সব মিলিয়ে নতুনভাবে আবার অ্যাগ্রিমেন্ট করা হয় কি না, যে অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে এই সমালোচনাটা কমবে, এমনকি চীনও মনে করবে— হ্যাঁ, বাংলােদশ তার সার্বভৌমত্ব এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখছে। এটা দেখা দরকার, আরও কয়েক মাস গেলে হয়তো ব্যাপারটি স্পষ্ট হবে।
যেটা প্রথমেই বললাম, এমওইউ সই করা আর এটাকে ইমপ্লিমেন্ট করার মধ্যে কিন্তু বড় একটা গ্যাপ আছে। তবে আমি মনে করি, যথেষ্ট সুযোগ তৈরি হয়েছে, বড় আকারেই সুযোগ তৈরি হয়েছে আমাদের জন্য। আমি যদি ইকোনমিক করিডরটাও দেখি, আর তারপর তো স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ যে ক্ষেত্রগুলোতে এমওইউ দেখলাম— মোটামুটি চীন বড় আকারেই প্রস্তুত সহযোগিতা করা, সাপোর্ট দেওয়ার জন্য। তবে তা নির্ভর করবে, বাংলােদশ সরকার এটাকে কতখানি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে তার ওপর।
তবে সবই জড়িত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ যে অ্যাগ্রিমেন্টটা করেছে, সেটার সঙ্গে— যেখানে আমেরিকার অনুমতি নেওয়ার বিষয়টির ইঙ্গিত আছে। যেটা আমরা হরমুজের ক্রাইসিসের সময় দেখলাম— রাশিয়া থেকে তেল আনার ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি নেওয়া ইত্যাদি। এখন এ কাঠামোটা নিয়ে চীনের সঙ্গে বড় আকারের সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব নয়। সেটাই পরিষ্কার করে দিয়েছে ওই ‘টু প্লাস টু’, আর এই তাইওয়ানের ব্যাপারে বাংলাদেশের বড় ধরনের যে প্রতিশ্রুতি। এখন দেখা দরকার, যে এমওইউগুলো সই করা হয়েছে, সেগুলোকে কার্যত কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কারণ, সই করা এক জিনিস, আর সেটা ইমপ্লিমেন্ট করা আরেক জিনিস। এখন ওই ইমপ্লিমেন্ট করার যে দায়িত্ব, অনেকটাই বলতে গেলে সেটা বাংলাদেশ তথা বাংলাদেশ সরকারের ওপর পড়ছে। আমি মনে করি, সরকার স্বাভাবিকভাবেই চাইবে যে, বড় ধরনের অর্থনৈতিক কাঠামো যাতে তৈরি হয়। এর সঙ্গে এমপ্লয়মেন্ট জড়িত, অর্থনীিতকে আবার পুনরুদ্ধার করার বিষয় রয়েছে। কারণ, গত দুই বছরে যেহেতু বিনিয়োগ একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সে জায়গায় বড় পরিবর্তন করার একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেদিক থেকে যথেষ্টই ইতিবাচক ছিল এ সফর।
বিদেশ সফরের শুরুতেই একেবারে সরাসরি চীনে গেলে যুক্তরাষ্ট্র বা অনেক দেশই হয়তো অন্যভাবে দেখত, সেটাকে কিছুটা ডাইলিউট (হালকা) করার জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রথমেই মালয়েশিয়া যান। কারণ, মালয়েশিয়ার সফরটা ওই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। মালয়েশিয়া নিজেও খুব একটা যে হোমওয়ার্ক করেছে গত দুই বছর, সেটা আমরা দেখিনি— যেটা আমরা চীনের ক্ষেত্রে দেখেছি। গত দুই বছরে চীনের একাধিক ডেলিগেশন টিম নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে এসেছে। নিয়মিতভাবে আলোচনা করেছে, যাতে এই হোমওয়ার্কটা বড় আকারে হয়ে থাকে। কারণ তারা জানত, নির্বাচিত সরকার একসময় আসবে, তখন তারা কাজে নামবে। ওই ধরনের তৎপরতা আমরা কখনো মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে দেখিনি। সেদিক থেকে বলব, তারা হয়তো কিছুটা অবাকই হয়েছে—বাংলােদশের প্রধানমন্ত্রী শুরুতেই মালয়েশিয়ায় গেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বন্ধ শ্রমবাজার দ্রুত খুলে দেওয়ার কথা বলেছেন। আগেও ওই ধরনের কথা হয়েছে। এটা যথেষ্ট জটিল বিষয়। মালয়েশিয়ার লোক প্রয়োজন, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বড় আকারে পরিবর্তন করাও আমার মনে হয় না আপাতত সম্ভব। তবে যেহেতু সফরে যাওয়া হয়েছে, আলোচনা হয়েছে, সেখান থেকে হয়তো আগামীতে আমরা কিছু দেখতে পাব।
লেখক: সাবেক অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




