কেন জনগণকে সোনা কিনতে মানা করছেন মোদি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি- সংগৃহীত
ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (ফরেক্স) সুরক্ষিত রাখতে জনগণকে আগামী এক বছর সোনা কেনা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতায় বিশ্ব অর্থনীতি যখন টালমাটাল, তখন দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই এই নজিরবিহীন পদক্ষেপের কথা বলছেন সরকারপ্রধান। যদিও হায়দরাবাদ থেকে তার এমন অনুরোধ আসার পর থেমে নেই আলোচনা-সমালোচনা।
কেন এই কঠোর বার্তা?
মোদির এই আহ্বানের নেপথ্যে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা, যা কমছে প্রতিনিয়তই। ১ মে পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, এক সপ্তাহে ভারতের ফরেক্স প্রায় ৭৭৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার কমে দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৬৯ কোটি ডলারে। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ায় আমদানি খরচ হয়েছে আকাশচুম্বী।
ভারত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সোনা আমদানিকারক দেশ। প্রতি বছর ৭০০-৮০০ টন সোনার চাহিদা থাকলেও দেশটিতে উৎপাদন হয় মাত্র ১-২ টন। ফলে চাহিদার ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আনতে হয় ডলার খরচ করে।
গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ভারত রেকর্ড ৭ হাজার ২০০ কোটি ডলারের (প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা) সোনা আমদানি করেছে। যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। ভারতের মোট আমদানির ৯ শতাংশই খরচ হয় সোনায়। যা দেশটির শিল্পোৎপাদনে কোনো সরাসরি ভূমিকা রাখে না। এই বিশাল অংকের ডলার সাশ্রয় করতেই সোনা কেনায় লাগাম টানতে চাইছেন নীতিনির্ধারকরা।
কি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে?
জনগণকে দেশপ্রেমিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মোদি বলছেন, আগামী এক বছর নতুন কোনো সোনার গয়না কেনা চলবে না।
তিনি মনে করিয়ে দেন, অতীতে যুদ্ধের সংকটে মানুষ সোনা দান করে দিত। এখন দান না করলেও অন্তত নতুন কেনা বন্ধ করে বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচাতে হবে। মূলত তেলের উচ্চমূল্যের কারণে অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, সোনা আমদানিতে রাশ টেনে সেই ঘাটতি পূরণ করাই সরকারের লক্ষ্য।
কীভাবে প্রভাব পড়ছে বাজারে?
সরকারি কড়াকড়ি ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রভাবে ইতিমধ্যেই সোনা আমদানিতে বড় ধস নেমেছে দেশটিতে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যেখানে ১০০ টন সোনা আমদানি হয়েছিল, এপ্রিলে তা নেমে এসেছে মাত্র ১৫ টনে। মহামারি বাদে গত ৩০ বছরে ভারতে আমদানির পরিমাণ এতটা কমেনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পশ্চিম এশিয়ায় ইরান-ইসরায়েল সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম আরও বাড়বে। এমতাবস্থায় বিলাসদ্রব্য হিসেবে গণ্য হওয়া সোনার পেছনে বিপুল ডলার খরচ কমানো গেলে শক্ত থাকবে দেশের অর্থনীতির ভিত।
নরেন্দ্র মোদি আশা করছেন, দেশবাসী ব্যক্তিগত আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে এই ‘স্বর্ণ-সংযম’ পালন করবেন।
বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া
তবে নরেন্দ্র মোদির এমন ঘোষণার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশটির প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী। এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে তিনি একে সরকারের ‘পরিকল্পনার অভাব’ এবং ‘ব্যর্থতার প্রমাণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, সরকার নিজের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে দায়িত্ব চাপিয়ে দিচ্ছে সাধারণ জনগণের ওপর।
এদিকে, সোমবার এই বক্তব্যের বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে ভারতের শেয়ার বাজারে। দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কায় সেনসেক্স সূচক লেনদেনের শুরুতেই এক হাজার পয়েন্টের বেশি পড়ে যায়।
অপরদিকে, জ্বালানি সংকটে কাঁচ ও প্লাস্টিক শিল্পের লাখ লাখ কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়ায় এবং সারের সংকটে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ার আশঙ্কায় জনমনে ও সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।




