কী কারণে লড়ছে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান?

অস্ত্র হাতে সীমান্তে টহল দিচ্ছেন আফগান সেনারা। ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্তে উত্তেজনা চলছিল। এর জেরে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে আফগানিস্তানের কয়েকটি স্থানে হামলা চালিয়েছে প্রতিবেশী পাকিস্তান।
পাকিস্তানের হামলায় আফগানিস্তানে তালেবানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
মূলত কাবুল পাকিস্তানের সেনাদের ওপর হামলার পর এ সংঘাতের শুরু।
আফগানিস্তানের অন্তত ১৩৩ জন নিহত ও দুই শতাধিক আহত হয়েছেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের ৫৫ জনকে হত্যার দাবি করেছে তালেবান।
এদিকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ পরিস্থিতিকে ‘পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন।
মূলত গত সপ্তাহে আফগানিস্তানে জঙ্গিদের লক্ষ্যবস্তুতে পাকিস্তান বিমান হামলা শুরু করার পর থেকে উত্তেজনা তীব্র হয়।
এর আগে, অক্টোবরে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষে কয়েক ডজন সৈন্য নিহত হয়। যে সংঘাত পরবর্তীতে তুরস্ক, কাতার এবং সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় থামে।
প্রতিবেশী দুই দেশ কেন বিরোধে জড়িয়েছে?
২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসাকে পাকিস্তান স্বাগত জানিয়েছিল। তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছিলেন, আফগানরা দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলেছে।
কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলামাবাদ বুঝতে পারে, তারা যেমন সহযোগিতা আশা করেছিল, তালেবান তেমনটি করছে না।
ইসলামাবাদ বলছে, জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর নেতা এবং তাদের অনেক যোদ্ধা আফগানিস্তানে অবস্থান করছে। এছাড়া পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশের স্বাধীনতার দাবিতে লড়াই করা সশস্ত্র বিদ্রোহীরাও আফগানিস্তানকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিশ্বব্যাপী নজরদারি সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে প্রতি বছরই জঙ্গি তৎপরতা বেড়েছে; টিটিপি ও বেলুচ বিদ্রোহীদের হামলাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে কাবুল বারবার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আফগান তালেবান অভিযোগ করে যে পাকিস্তান তাদের শত্রু ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধাদের আশ্রয় দিচ্ছে—যা ইসলামাবাদ অস্বীকার করেছে।
ইসলামাবাদ বলছে, আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানে জঙ্গি হামলা অব্যাহত থাকায় যুদ্ধবিরতি বেশিদিন টেকেনি। এরপর থেকে বারবার সংঘর্ষ ও সীমান্ত বন্ধের ঘটনা ঘটেছে, যা দুর্গম সীমান্তজুড়ে বাণিজ্য ও যাতায়াতে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সূত্রপাত কীভাবে হলো?
গত সপ্তাহে হামলার আগের দিন পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানায় যে, আফগানিস্তানে অবস্থানরত জঙ্গিরাই পাকিস্তানের সামরিক ও পুলিশ বাহিনীকে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক হামলা ও আত্মঘাতী বিস্ফোরণগুলো ঘটিয়েছে। এ বিষয়ে অকাট্য প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে।
তারা জানায়, ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে জঙ্গিদের পরিকল্পিত বা সফল সাতটি হামলার ঘটনা রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে আফগানিস্তানের সংযোগ আছে বলে তারা দাবি করে।
গত সপ্তাহে বাজাউর জেলায় এক হামলায় ১১ জন নিরাপত্তা সদস্য ও দুইজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্র অনুযায়ী, এই হামলাটি একজন আফগান নাগরিক চালিয়েছিল। হামলার দায় স্বীকার করে টিটিপি।
পাকিস্তানি তালেবান কারা?
টিটিপি ২০০৭ সালে উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে সক্রিয় কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন মিলে গঠন করা হয়। এটি সাধারণত পাকিস্তানি তালেবান নামে পরিচিত।
টিটিপি বাজার, মসজিদ, বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি ও পুলিশ স্টেশনে হামলা চালিয়েছে। তারা কিছু এলাকায় নিয়ন্ত্রণও প্রতিষ্ঠা করেছিল—বিশেষ করে আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে।
এই সংগঠনটি ২০১২ সালে তৎকালীন স্কুলছাত্রী মালালা ইউসুফজাইয়ের ওপর হামলার পেছনে ছিল। দুই বছর পর তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
টিটিপি আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান তালেবানের সঙ্গে লড়াই করেছে এবং পাকিস্তানে আফগান যোদ্ধাদের আশ্রয়ও দিয়েছে।
পাকিস্তান নিজ ভূখণ্ডে টিটিপির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে, তবে সাফল্য ছিল সীমিত। যদিও ২০১৬ সালে শেষ হওয়া এক বড় সামরিক অভিযানের ফলে কয়েক বছর ধরে হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।
এরপর কী ঘটতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান তাদের সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারে।
অন্যদিকে বসে থাকবে না কাবুলও। তারা হামলার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের সীমান্ত চৌঁকিতে হামলা বাড়াবে। পাশাপাশি পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলার মাত্রা আরো বাড়াবে।
কাগজে-কলমে দুই পক্ষের সামরিক সক্ষমতার মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য। তালেবানের রয়েছে মাত্র ১ লাখ ৭২ হাজার সদস্য।
তালেবানদের কাছে অন্তত ছয়টি বিমান ও ২৩টি হেলিকপ্টার রয়েছে, তবে সেগুলোর কার্যক্ষমতা অজানা। তাদের কোনো যুদ্ধবিমান বা কার্যকর বিমানবাহিনী নেই।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীতে ৬ লাখের বেশি সক্রিয় সদস্য রয়েছে। দেশটির রয়েছে ৬ হাজারের বেশি সাঁজোয়া যুদ্ধযান। পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান রয়েছে ৪০০-র বেশি। দেশটি পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিতও।

