যুদ্ধবিরতির পরও তেল সংকট, কবে শেষ হবে?

যুদ্ধের সময় হরমুজ ইরানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফাইল ছবি
বুধবার সকালে ৪০ দিনের সংঘাতের পর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে স্থায়ী চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে শুক্রবার।
ইরানের কাছে দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাবের অন্যতম প্রধান ছিল হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করার অনুমতি দেওয়া। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এটি কার্যত বন্ধ।
এতে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী। স্বাভাবিক সময়ে এই প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয় বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস।
গত ছয় সপ্তাহে সংকটের কারণে ১০০টিরও বেশি দেশ দাম বাড়িয়েছে পেট্রোলের। প্রধানত এশিয়ার বেশ কয়েকটি সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে জ্বালানি সংকটের কারণে। এছাড়া ব্যবহার সীমিত করার জন্য নিয়েছে কঠোর ব্যবস্থা।
সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরেই বুধবার ৯২ ডলারে নেমে আসে তেলের দাম। যুদ্ধের বেশিরভাগ সময় এটি ১১০ ডলারের অনেক উপরে ছিল।
তেলের বাজার থেকে কয়েক কোটি ব্যারেল তেল উধাও করে দিয়েছে ইরান যুদ্ধ। তাই সহসাই কমছে না এ সংকট।
নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা এবং লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা
জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও হাজার হাজার মাইল দূরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বড় তেল ট্যাংকারগুলো। এগুলো আগে ফিরতে হবে উপসাগরে। লাখ লাখ ব্যারেল তেল বোঝাই করতে সময় লাগবে কয়েক সপ্তাহ।
যুদ্ধবিরতির পরবর্তী দুই সপ্তাহজুড়ে জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখার নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।
সংঘাত শুরুর সময় খুব কমসংখ্যক ট্যাংকারই তেল বোঝাই বা খালাস করতে পারছিল।
ফলে উৎপাদকরা তাদের মজুদ পুরো থাকায় বন্ধ করতে শুরু করে তেল কূপগুলো। এতে আঞ্চলিক তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
কূপগুলো পুনরায় চালু করা সুইচ টিপে দেওয়ার মতো সহজ কাজ নয়; এটি ব্যয়বহুল এবং প্রযুক্তিগতভাবে বেশ জটিল। উৎপাদন ও পরিবহন পুনরায় শুরু হতে বিলম্বের কারণে জ্বালানি সংকট এখনই শেষ হবে না।
অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচের উপর এর আসল প্রভাব সম্ভবত ২০২৬ সালজুড়ে এবং ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্তও অব্যাহত থাকবে। এছাড়াও যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হওয়া স্থাপনাগুলো মেরামত করতে কয়েক বছর সময় লাগবে উপসাগরীয় দেশগুলোর।
ইরান যুদ্ধের কারণে কী পরিমাণ তেল নষ্ট হয়েছে?
বাজার পর্যবেক্ষণকারী ফার্ম কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ইরাক, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্মিলিত রপ্তানি ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মার্চে কম হয়েছে ২০৬ মিলিয়ন ব্যারেল। ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি ছিল ৪৬৯ মিলিয়ন ব্যারেল। এক মাসে মোট রপ্তানি কমেছে ৪৪ শতাংশ।
ওমান ছাড়া তেল রপ্তানিকারক প্রধান পাঁচটি দেশের বন্দর, কূপ, পাইপলাইন ও শোধানাগার শিকার হয়েছে ভয়াবহ হামলার।
কোন তেল উৎপাদনকারী দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরাকের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি। আগের মাস থেকে মার্চে ৮২ শতাংশ কমে গেছে তেল রপ্তানি। ফেব্রুয়ারির ৯৪ মিলিয়ন ব্যারেল মার্চে নেমে এসেছে ১৭ মিলিয়ন ব্যারেলে।
কুয়েত এবং কাতার উভয়ের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি কমে গেছে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ, যা যথাক্রমে আগের মাস থেকে মার্চে ৭৫ এবং ৭০ শতাংশ কম।
ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানি কমেছে যথাক্রমে ৩৪ এবং ২৬ শতাংশ।
এক্ষেত্রে ওমান ছিল একমাত্র ব্যতিক্রম। যার অনেক বন্দর প্রণালীর বাইরে অবস্থিত। দেশটির রপ্তানি ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে মার্চ মাসে। ফেব্রুয়ারির ২৫ মিলিয়ন ব্যারেল মার্চে দাঁড়িয়েছে ২৯ মিলিয়ন ব্যারেলে।
২০৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল দিয়ে কয়টি তেল ট্যাংকার ভর্তি করা যাবে?
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যে ২০৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল নষ্ট হয়েছে, তা দিয়ে ভর্তি করা যেত প্রায় ১০৩টি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ভিএলসিসি)। বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের প্রধান সুপারট্যাংকার হিসেবে পরিচিত এসব ভিএলসিসি।
ভিএলসিসি হলো সমুদ্রের অন্যতম বৃহত্তম ও ভারী জাহাজ এবং এগুলো বিশ্বের মহাসাগরজুড়ে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহনের জন্য নির্মিত। কেবল আল্ট্রা লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার (ইউএলসিসি) জাহাজগুলোই এর চেয়ে বড়, যেগুলোর বহনক্ষমতা ৩০ লাখ ব্যারেল।
ভিএলসিসির তুলনায় ইউএলসিসি কম ব্যবহার হয়। কারণ এগুলোর গভীরতা কমপক্ষে ২৪ মিটার (৮০ ফুট), যা বিশ্বের অধিকাংশ জলপথ ও বন্দরে চলাচলের জন্য খুবই গভীর।
খুব বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজগুলো কতটা বড় হয়?
একটি ভিএলসিসির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৩০ মিটার (১,০৮০ ফুট) , যা প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের প্রায় সমান উচ্চতা। যদিও প্রযুক্তিগতভাবে দৈর্ঘ্যে বড় ক্রুজ জাহাজ রয়েছে, তবে ডিসপ্লেসমেন্ট এবং ওজন বহনক্ষমতার দিক থেকে ভিএলসিসিগুলোই বৃহত্তম।
ভিএলসিসিগুলো সাধারণত ৫০-৬০ মিটার (১৬৪-১৯৭ ফুট) চওড়া হয় এবং সম্পূর্ণ বোঝাই অবস্থায় এর গভীরতা ২০-২২ মিটার (৬৬-৭২ ফুট) হয়ে থাকে।
এক ব্যারেল তেল থেকে কী পরিমাণ পেট্রোল উৎপাদন করা যায়?
১৫৯ লিটার বা ৪২ ইউএস গ্যালনে অপরিশোধিত তেলে হয় এক ব্যারেল । পরিশোধনের পর এক ব্যারেল থেকে সাধারণত উৎপন্ন হয় প্রায় ৭৩ লিটার (১৯.৩৬ গ্যালন) পেট্রোল বা গ্যাসোলিন। বাকি অংশ থেকে তৈরি হয় ডিজেল, জেট ফুয়েল ও অন্য পণ্য ।
২০৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের মূল্য কত?
অপরিশোধিত তেলকে শ্রেণিভুক্ত করা হয় এর ঘনত্ব এবং সালফারের পরিমাণভেদে। কম সালফারযুক্ত তেল ‘সুইট ক্রুড’ নামে পরিচিত এবং এটি অধিক মূল্যবান। কারণ এর পরিশোধন প্রয়োজন হয় কম।
বৈশ্বিক মানদণ্ডটি ব্রেন্ট ক্রুড নামে পরিচিত। তেল একটি বৈশ্বিক পণ্য হিসেবে লেনদেন হয়। বিশ্বে যেকোনো সংকটে ধারাবাহিক প্রভাব পড়তে পারে তেলের দামে।
যুদ্ধের বেশিরভাগ সময়ই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের উপরে ছিল এবং ২ এপ্রিল তা সর্বোচ্চ দাম প্রায় ১২৮ ডলারে পৌঁছায়।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ব্রেন্ট তেলের গড় দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৫ ডলার।
সে হিসাবে ২০৬ মিলিয়ন ব্যারেল রপ্তানি তেলের মূল্য ৮০ ডলার করে হলেও ১৬.৪ বিলিয়ন ডলার। আর ১০০ করে হলে ২০.৬ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, ১২০ করে ধরলে তা দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে।
আলজাজিরা থেকে অনূদিত, ভাষান্তর : মাহমুদুল হাসান রিফাত















