আগামীর সময়

ঠুঁটো জগন্নাথ জাতিসংঘ

ঠুঁটো জগন্নাথ জাতিসংঘ

নিরাপত্তা পরিষদের সভায় সভাপতিত্ব করেন মেলানিয়া ট্রাম্প। ছবি সংগৃহীত

আরেকটি লড়াই শুরু হওয়ার পর জাতিসংঘকে নিয়ে পুরনো সেই প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। প্রশ্নটি হচ্ছে নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া ছাড়া কি সংস্থাটির আর কোনো কাজ আছে? এটি যে অকার্যকর হয়ে পড়েছে তা এখন স্পষ্ট। কেননা, যে সংঘাত মেটাতে অভিভাবকের ভূমিকায় থাকার কথা সংস্থাটির, সেখানে এটি থেমে থাকছে বিবৃতি দিয়েই।

ইরানে গত শনিবার হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। হামলার শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হন। এরপর দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে হামলা চালানো হয়। সেখানে নিহত হয়েছে দেড়শতাধিক শিক্ষার্থী। এছাড়া ইরানজুড়ে নির্বিচারে হামলা চলাচ্ছে ইসরায়েল। যাতে এ পর্যন্ত প্রায় ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে ইরানও কম যায় না। দেশটি খামেনি হত্যার শোধ নিতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলায় বিভিন্ন দেশে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। জ্বালানি সরবরাহের লাইফলাইনখ্যাত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। সৌদি আরব ও কাতারে জ্বালানি স্থাপনায় করেছে হামলা। যার কারণে বিশ্বজুড়ে বেড়ে গেছে জ্বালানির দাম।

এছাড়া লেবাননও জড়িয়ে গেছে এই যুদ্ধে। সেখানে গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহরে নির্বিচারে হামলা করছে ইসরায়েল। সেখানেও অর্ধশতাধিক প্রাণহানির খবর মিলেছে।


এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধ থামাতে জাতিসংঘ কার্যকর কোনো ভূমিকা নিতে পারছে না বা সংস্থাটিকে সংকট সমাধানে এগিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে না। পরিবর্তে সংস্থাটি নিজেদের কার্যক্রম বিবৃতি দেওয়া, হামলার নিন্দা জানানো এবং উদ্বেগ প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ প্রসঙ্গে সোমবার নিউ ইয়র্কে আয়োজিত নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক জানান, এই সংঘাত পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

মুখপাত্র জানান, গত কয়েক দিনে ইরান, কাতার এবং লেবাননসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে হামলার বিস্তার ঘটেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ইরানের মিনাব এলাকায় একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় বহু শিক্ষার্থী হতাহত হওয়ার খবরে গভীর শোক ও নিন্দা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, জাতিসংঘ মহাসচিব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাতার ও ওমানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। তিনি অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ এবং জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।

কাতার ও ওমানের ওপর হওয়া হামলার নিন্দা জানিয়ে মহাসচিব বলেছেন, যেসব দেশ সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত নয়, তাদের ওপর হামলার বিস্তার অত্যন্ত বিপজ্জনক লক্ষণ।

ইউনিসেফ এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক পৃথক বিবৃতিতে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধের সময়েও বেসামরিক নাগরিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষা করা বাধ্যতামূলক।

এদিকে ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক হয়। কিন্তু ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি বোমা হামলার বিষয়ে কোনো প্রস্তাব পাস হয়নি।

লেবানন সীমান্তে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে গোলাগুলি এবং প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন। সেখানে অবস্থানরত শান্তিরক্ষীদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।

এর আগেও ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয় জাতিসংঘ। যে যুদ্ধে ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে ইসরায়েল। গাজায় এখনো হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধ থামাতেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি।

এর মধ্যে ভেনেজুয়েলা থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেনারা। সে ঘটনায়ও নিন্দা জানিয়ে নিজের কাজ সেরেছে জাতিসংঘ।

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযান প্রসঙ্গে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে বন্দি করে নিয়ে গেছে সেটি 'গভীর উদ্বেগের'। মার্কিন অভিযানের ঘটনাটি ওই অঞ্চলের ওপর 'উদ্বেগজনক প্রভাব' ফেলবে।

তিনি আরো বলেছেন, ভেনেজুয়েলায় ঘটনা ঘটেছে, সেটি একটি 'বিপজ্জনক নজির' সৃষ্টি করতে পারে।

জাতিসংঘের বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘ সনদসহ আন্তর্জাতিক সব আইনের প্রতি সবাইকে পূর্ণ সম্মান প্রদর্শনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন মহাসচিব। তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এই কারণে যে, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনগুলোকে সম্মান করা হয়নি।

ভেটো বিড়ম্বনায় জাতিসংঘ

কাগজে-কলমে নিরাপত্তা পরিষদ জাতিসংঘের সবচেয়ে শক্তিশালী অঙ্গসংগঠন৷ এর কাজ বিশ্বজুড়ে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা৷ কিন্তু কাজটা নিরাপত্তা পরিষদ করতে পারছে না। এর মূল কারণ বিশ্ব মোড়লদের ভেটো ক্ষমতার ব্যবহার।

১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভেটো প্রয়োগের ইতিহাস খুঁজে দেখলেই এর একটা পরিষ্কার চিত্র দেখতে পাওয়া যায়৷ এখন পর্যন্ত এই ক্ষমতা ৩০০ বারের বেশি ব্যবহার হয়েছে। যার মধ্যে রাশিয়া একাই ১২০ বার ভেটো দিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদে। এগুলো দেওয়া হয়েছে নানা ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে।

এরপরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি বিভিন্ন বিষয়ে ৯০ বারের মতো ভেটো দিয়েছে। এগুলো হয় ইসরায়েলকে রক্ষা করার জন্য অথবা মধ্যপ্রাচ্য/পানামা সংক্রান্ত বিষয়ে।

এছাড়া যুক্তরাজ্য ২৯ বার, ফ্রান্স ১৬ বার ও চীন ১৬ থেকে ১৯ বার এই ভেটো ক্ষমতার ব্যবহার করেছে।

জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে এই ভেটো ক্ষমতা সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে।

আফগানিস্তানে বা ইরাকে মার্কিন সেনা অভিযান ঠেকাতে, ফিলিস্তিনের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ইসরায়েলি সেনাদের বর্বরতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ বন্ধ করতে কিংবা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জাতিগত সহিংসতা থামাতে গিয়ে জাতিসংঘ এই এক ভেটো ক্ষমতার কাছে ব্যর্থ হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে অভিযুক্ত পক্ষের সঙ্গে কোনো কোনো বৃহৎ শক্তির স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা থাকায় তারা একক ক্ষমতায় ঠেকিয়ে দিয়েছে৷

এবার ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে হামলা চালাচ্ছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটোক্ষমতাসম্পন্ন যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ধরে নেওয়া যায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে কোনো প্রস্তাব উঠলে সেটিতে ভেটো দেবে যুক্তরাষ্ট্র।


অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের মিত্র ইরানের বিরুদ্ধে এই পরিষদে কোনো প্রস্তাব উঠলে তা ঠেকিয়ে দিতে পারে দেশ দুটি। ফলে সংকট সমাধানে বিবৃতি দেওয়া, উদ্বেগ জানানো ছাড়া সংস্থাটির বাস্তবিক কোনো কার্যক্রম থাকছে না। এই অবস্থায় এটি টিকে আছে ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে।



    শেয়ার করুন: