খামেনি যেভাবে দরিদ্র পরিবার থেকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী নেতা

সংগৃহীত ছবি
ইতিহাসের সফল বিপ্লবগুলোর পেছনে বেশিরভাগ সময়ই নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে অনুপ্রেরণাদায়ী, ক্যারিশম্যাটিক কোনও নেতৃত্বকে। তাদের চেয়ে তুলনামূলক কম ক্যারিশম্যাটিক নেতারা নেতৃত্ব দেন বিপ্লব পরবর্তী নতুন আদর্শ ও শাসনব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুসংহত করতে। ইরানে দ্বিতীয় ভূমিকাটিই পালন করেছিলেন ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় নিহত দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মতো বিপুল জনসমর্থন কখনোই পাননি আলি খামেনি। বরং তার শাসন ক্রমশই জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। কিন্তু ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর দায়িত্ব নিয়ে তিনি ধর্মীয় নেতৃত্বাধীন অনন্য এই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সুসংহত করতে সক্ষম হন। পাশাপাশি ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও রক্ষণশীল আরব রাজতন্ত্রগুলোর এক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করেন।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকা নেতা হিসেবে আলি খামেনি বহু ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন। ১৯৮১ সালে একটি টেপ রেকর্ডারের ভেতরে লুকানো বোমা বিস্ফোরণে তার ডান হাত ও বাহু কার্যত অচল হয়ে যায়। একাধিকবার গণবিক্ষোভ তার শাসনকে নাড়িয়ে দেয়। তবু তিনি অনেক প্রভাবশালী ইরানি নেতাকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে টিকে ছিলেন।
শুরুর দিকে ১৯৮৯-৯৭ মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকা আলি আকবার হাসেমি রাফসানজানির তুলনায় প্রভাব কম ছিল খামেনির। রাফসানজানিই মূলত আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আলি খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে খামেনি রাফসানজানিকে ছাড়িয়ে যান।
খামেনির আমলে ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। ইরাক, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন স্থানে সামরিক অভিযান পরিচালনা, ইরানি স্বার্থ রক্ষায় মিলিশিয়া গড়ে তোলা এবং অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে কাজ—সবক্ষেত্রেই আইআরজিসি সক্রিয় ছিল।
খামেনি ধর্মীয় ফাউন্ডেশনগুলোর সম্পদ ব্যবহার করে অনুগতদের পুরস্কৃত করতেন। ক্ষমতায় আসার পর সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির মতো তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজের দপ্তরের প্রতিনিধিদের বসান। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি সম্ভাব্য ‘আয়াতুল্লাহ মিখাইল গর্বাচেভদের’ বিষয়ে সতর্ক ছিলেন যারা ভেতর থেকে সংস্কার করে পশ্চিমা প্রভাব বাড়াতে পারেন। শেষ পর্যন্ত এ ধরনের সম্ভাব্য সংস্কারপন্থীদের সরিয়ে দেওয়া হয়।
জীবনের শেষ বছরে খামেনির শাসন ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভ তার মধ্যে অন্যতম। তিনি কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান; ইসরায়েলের দিকে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেন এবং নিজ দেশের হাজার হাজার নাগরিক নিহত হয়। নতুন যুদ্ধের হুমকি বাড়লেও তিনি পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে ৮৬ বছর বয়সে এক বিমান হামলায় তার মৃত্যু তার পররাষ্ট্রনীতির সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করে এবং শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।
কে ছিলেন আলি খামেনি
১৯৩৯ সালে ইরানের পূর্বাঞ্চলীয় পবিত্র নগরী মাশহাদে জন্ম নেওয়া খামেনির পিতা ছিলেন আজারবাইজানি এবং মাতা পারস্যের বংশোদ্ভূত। আট সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তার বর্ণনা অনুযায়ী, পরিবার এতটাই দরিদ্র ছিল যে অনেক সময় রাতের খাবারে কেবল রুটি ও কিশমিশ থাকত। ছোটবেলায় তিনি ধর্মীয় শিক্ষায় প্রবেশ করেন।
তার রক্তেই ছিল বিদ্রোহের ধারা। বিশ শতকের শুরুতে পূর্ববর্তী এক রাজবংশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সমর্থনকারী ধর্মীয় পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে তিনি অল্প বয়সেই শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর বিরোধিতা শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেগের বিরুদ্ধে সিআইএ সমর্থিত অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষুব্ধ হন। তরুণ বয়সে তিনি ইসলামপন্থী নবাব সাফাভির মাধ্যমে প্রভাবিত হন যাকে পরবর্তীতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দেওয়া হয়।
খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরকারের প্রতি গভীর বৈরিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন—কারণ তারা শাহের প্রধান সমর্থক ছিল এবং মুসলমানদের অধিকার দমনের প্রতীক হিসেবে দেখা হত তাদের। তিনি মিশরীয় ইসলামি চিন্তাবিদ সাইয়েদ কুতবের রচনা ফারসিতে অনুবাদ করেন। একইসঙ্গে ফরাসি সাহিত্যিক ভিক্টর হুগোর লা মিজারেবল বইটিরও বড় ভক্ত ছিলেন, যাকে তিনি ‘অলৌকিক’ বলে উল্লেখ করেন।
তিনি কুম শহরে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণকালে খোমেনির সংস্পর্শে আসেন। সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার কারণে একাধিকবার কারাবরণ করেন এবং শাহের গোপন পুলিশ ‘সাভাকের’ নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত হন, যার মধ্যে ১৯৮১ সালে সন্ত্রাসী হামলায় প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলি রাজাই নিহত হওয়ার পর টানা দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদও অন্তর্ভুক্ত।
খামেনেই সর্বোচ্চ নেতার পদে আসেন তখনই, যখন খোমেনির মনোনীত উত্তরসূরি হোসেইন আলি মোনতাজেরিকে ১৯৮৮ সালে রাজনৈতিক বন্দিদের মৃত্যুদণ্ডের সমালোচনার কারণে প্রত্যাখ্যান করা হয়। খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের পরই আয়াতুল্লাহ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
পরবর্তী সময়ে সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি ‘সভ্যতার সংলাপ’ ধারণা তুলে ধরলে এবং রাজনৈতিক-সামাজিক উন্মুক্ততার চেষ্টা করলে খামেনি তা প্রতিহত করেন। সংবাদপত্র বন্ধ, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা এবং নিরাপত্তা সংস্থার মাধ্যমে দমনপীড়ন এসব ছিল তার কৌশল।
২০০৫ ও ২০০৯ সালে তিনি রক্ষণশীল মাহমুদ আহমেদিনেজাদকে সমর্থন করেন। ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত বৃহৎ বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়।
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর আঞ্চলিক পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে ইরান প্রভাব বাড়ায়। সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সরকারকে সমর্থন, লেবাননে হিজবুল্লাহকে শক্তিশালী করা এবং ইয়েমেনে হুথিদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার ছিল তার কৌশলের অংশ।
২০১৫ সালে ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ নামে পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদনে তিনি ‘বীরোচিত নমনীয়তা’ প্রদর্শন করেন। তবে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে সরে গেলে খামেনির দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়।
এই দীর্ঘ শাসনামলে তিনি কঠোরতা, কৌশল ও প্রয়োজনে আপসের সমন্বয়ে ক্ষমতা ধরে রাখেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কৌশলও তার সহিংস পরিণতি ঠেকাতে পারেনি।

