শূন্য শহরের গান...

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এ শহর এখন শূন্যতার উৎসব। দীর্ঘ ছুটির অবসরে নাগরিকরা তাদের প্রতিদিনের আবাসস্থলকে একা করে দিয়ে চলে গেছে নিজস্ব ঠিকানায়। পড়ে আছে শূন্য পথ। শাটার টানা দোকানপাট যেন রূপকথার গল্পে ঘুমের রাজ্য। বিশাল বিশাল অট্টালিকা, অফিস বাড়ি আলস্যে হাই তুলছে। দিনেরবেলা শূন্য শহরের পথে পাগলের মতো একা একা আছড়ে পড়ছে রোদ অথবা বৃষ্টি। কৃষ্ণচূড়া ফুল আলোকিত করছে নির্জন রাজপথ, কোনো বারান্দায় একা জেগে আছে সন্ধ্যামালতী।
এই ঢাকা শহরের রাতগুলোও এখন অদ্ভুত নির্জন। দু-একটা দ্রুতগতি গাড়ির হেডলাইটের আলোর অস্থির ছোটাছুটি, কখনো ব্যাটারিচালিত রিকশার একটানা চলার কর্কশ যান্ত্রিক শব্দ, অন্ধকার কাটাতে ছড়িয়ে পড়া স্ট্রিটলাইটের আলো, ব্যস, তারপর এই শহর নিরালা-নিঝুম। শুধু পাহারাওয়ালার বাঁশি, পুলিশের একা একা কথা বলা ওয়াকিটকি, মাতালের একলা প্রলাপ, খাবারের দোকানের সামনে কোনো ভিখারির পাতা হাতে ক্ষুধার রাজ্য, শহুরে নির্জনতার পর্দা সরিয়ে পথ চলে উদভ্রান্তের মতো।
এই শহরের জীবন কি আধুনিক? তার ভাগাড়ে জমে ওঠে কাঁঠালের উচ্ছিষ্টাংশ, বিয়েবাড়ি থেকে আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেওয়া খাবার, জবাই হওয়া পশুর নাড়িভুঁড়ি। অনায়াসে মেট্রো স্টেশনে বসে যায় পশুর হাট!
কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা নিউইয়র্ক শহরকে কবিতায় ডেকেছিলেন ‘স্লিপলেস সিটি’ নামে। নির্ঘুম সেই বিশাল শহরকে তিনি জেগে থাকতে দেখেছিলেন। আমাদের এই শহরও তো ঘুমায় না। সঙ্গে তার নাগরিকেরাও। কেউ কেউ বলেন, যে শহর যত বেশি রাত্রি জেগে থাকে জীবনপ্রবাহে সেই শহর নাকি তত বেশি আধুনিক। এই শহরের জীবন কি আধুনিক? তার ভাগাড়ে জমে ওঠে কাঁঠালের উচ্ছিষ্টাংশ, বিয়েবাড়ি থেকে আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেওয়া খাবার, জবাই হওয়া পশুর নাড়িভুঁড়ি। অনায়াসে মেট্রো স্টেশনে বসে যায় পশুর হাট!
আমাদের এই বিচিত্র নির্ঘুম শহর ছুটির অবসরে ঘুমিয়ে গেছে। একদিন আবার ক্যালেন্ডারের তারিখ হিসেব করে অদৃশ্য জাদুকর তার জাদুর কাঠি ছোঁয়ালেই প্রাণ পেয়ে জেগে উঠবে পাথর-প্রতিমা।
মানুষ এই শহরে আসে কোনো না কোনো গরজে। কেউ আসে কাজের সন্ধানে, কেউ চাকরির খোঁজে, কেউ ব্যবসার ধান্দায়, কেউ আবার হয়তো ভালোবাসার খোঁজে। আর এসেই জড়িয়ে যায়, আটকা পড়ে যায় শহরের জীবনে। অষ্টপ্রহর বাসিন্দাদের নানা অভিযোগ শহরের বিরুদ্ধে। মনের মধ্যে অপছন্দের দীর্ঘ তালিকা। কিন্তু তার পরেও এই শহরকেই আমরা আবার ভালোবাসি। শূন্যতার ভেতরে, নির্জনতার ভেতরে, ভীষণ নীরবতার ভেতরে শহরটা যখন মুখ গুঁজে বসে থাকে তখন কেমন মায়া হয়। মনে হয়, ডাকবাক্সে না-ফেলা প্রেমের চিঠির মতো অভিযোগের চিঠিগুলোই তো শহরটার জন্য নাগরিকদের ভালোবাসার চিহ্ন।
শহর কি শুধুই নিষ্ঠুরতা আর নির্মমতার বিস্তার ঘটায়। শহর কি শুধুই এক ধূসর জীবনের গল্প? এই শহরের কান্না, শহরের অভিমান, শহরের আনন্দকে কে কোথায় কবে বুঝতে চেয়েছে?
শহর মানুষ-নিরপেক্ষ নয়। মানুষ নিয়েই তার কারবার। কারো পেয়ালা বেদনায় ভরে ওঠে, কারো বা আনন্দে। সেখানে কখনো বেহাগ বাজে, আবার কখনো জয়জয়ন্তী। শহর স্থির হয়ে থাকে, তার পথঘাট, অট্টালিকা, তার আবর্জনা, তার শোভা, তার সমস্যা আর সমাধান জমে থাকে প্রতিদিনের গল্পে। এরই মাঝে শহরের বাসিন্দাদের বেঁচে থাকা, মরে যাওয়া।
সেই নির্ঘুম শহর, সেই ব্যস্ততায় পিষ্ট হওয়া শহর তাই যখন হঠাৎ করে ছুটির হাওয়া পেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তখন তাকে অচেনা কোনো নদীর পাড়ের দেশ বলে মনে হয়। হল্লা নেই, যন্ত্রযানের গগনবিদারী হর্ন নেই, বিবাদ নেই, রক্তচক্ষু নেই, পথে মানুষের ভিড় নেই। শুধু এক নির্জনতা এসে দখল নিয়েছে নগরজীবনের।
এই শহরে কারো শিকড় প্রোথিত হয় না? হয়তো না। শহর ব্যবহৃত হয় শুধু প্রয়োজনে।
এরকম দীর্ঘ ছুটিতে কত মানুষ চলে যায় শহর ছেড়ে? গণমাধ্যমে খবর ছাপা হয়, নাগরিকরা ছুটছে শিকড়ের টানে। এই শহরে কারো শিকড় প্রোথিত হয় না? হয়তো না। শহর ব্যবহৃত হয় শুধু প্রয়োজনে। গ্রামের ঠিকানায় স্বজনদের কাছে ফিরে গিয়ে এই নাগরিকরাই ভুলে থাকতে চায় শহরকে, তার নির্মম জীবনকে। শহর কি শুধুই নিষ্ঠুরতা আর নির্মমতার বিস্তার ঘটায়। শহর কি শুধুই এক ধূসর জীবনের গল্প? এই শহরের কান্না, শহরের অভিমান, শহরের আনন্দকে কে কোথায় কবে বুঝতে চেয়েছে? তবুও এই শহরের বিমুখ প্রান্তরের কাছে সবাই ফিরে আসে; প্রয়োজন তাদের ফিরিয়ে আনে। হয়তো তাই শুধু ব্যবহারে জীর্ণ শহরটাকে মাঝে মাঝে একা হয়ে থাকতে দেখে মনের মধ্যে অচেনা কষ্টের বোধ ঢেউ তোলে। সেই একলা শহরের গান আমরা কেউ শুনতে পাই না।






