ফ্রান্সে প্রবাসী বাংলাদেশি নারীদের পাশে ‘উইথ দ্য মাইন্ড’

তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘উইথ দ্য মাইন্ড’-এর নানা আয়োজন। ছবি: আগামীর সময়
ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি নারীদের ভাষাগত দক্ষতা, মানসিক সুস্থতা ও আত্মনির্ভরশীলতা গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘উইথ দ্য মাইন্ড’। প্রতিষ্ঠার তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ফরাসি ভাষা শিক্ষায় কৃতিত্ব অর্জনকারী নারী শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়েছে সংবর্ধনা। একই সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে সংগঠনটির তিন বছরের অর্জন, সেবামূলক কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
রবিবার প্যারিসের অদূরে পন্তা এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, বাংলাদেশি কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তি, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং গণমাধ্যমকর্মীরা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি জাহরিন হক নুপুর।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সংগঠনটির তিন বছরের কার্যক্রমের ওপর একটি সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা করা হয়। এতে জানানো হয়, ২০২৩ সালের জুন মাসে কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি নারীর উদ্যোগে সংগঠনটির যাত্রা শুরু। প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যে ফরাসি সরকারের স্বীকৃত নিবন্ধিত সংগঠনের মর্যাদা লাভ করে এটি। এরপর থেকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশি নারীদের জন্য বিনা মূল্যে বা স্বল্প ব্যয়ে ফরাসি ভাষা শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে সংগঠনটি।
জাহরিন হক নুপুর বলেন, প্রবাসজীবনে ভাষা না জানার কারণে পরিবার ও সমাজের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন অনেক নারী। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং কর্মসংস্থানসহ নানা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন তারা। এই বাস্তবতা থেকেই বাংলাদেশি নারীদের ভাষা শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং সামাজিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ‘উইথ দ্য মাইন্ড’-এর যাত্রা শুরু।
তিনি জানান, বর্তমানে সংগঠনটির অনলাইন ফরাসি ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন ৪৫০ জনের বেশি বাংলাদেশি নারী। এ পর্যন্ত সংগঠনের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফরাসি ভাষার ডিপ্লোমা পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬২ জন নারী। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ ও সহায়তা নিচ্ছেন আরও দুই শতাধিক।
‘আমাদের লক্ষ্য শুধু ভাষা শেখানো নয়। বরং নারীদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলা, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা এবং ফরাসি সমাজের মূলধারায় যুক্ত হতে সহায়তা করা।’
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী কাউন্সিলর তানিয়া তুনু। ‘ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি নারীদের জন্য ‘উইথ দ্য মাইন্ড’ একটি সময়োপযোগী ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। ভাষা শিক্ষা, প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা এবং আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সংগঠনটির ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।’
অনুষ্ঠানে ভাষা শিক্ষায় কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। পরে নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।
সম্প্রতি ফরাসি ভাষার বি-১ স্তরের ডিপ্লোমা অর্জনকারী আসমা আক্তার রুপু জানান, ‘প্রবাসে নতুন জীবন শুরু করতে ভাষা শেখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ‘উইথ দ্য মাইন্ড’ শুধু ভাষা শেখায়নি, আমাদের আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে দিয়েছে। এখন আমি নিজের সক্ষমতার ওপর অনেক বেশি বিশ্বাস করি।’
আরেক শিক্ষার্থী উম্মে সালমা বলেন, ‘অনেকবার মনে হয়েছে আর পারব না। কিন্তু সংগঠনের আপুদের আন্তরিক সহযোগিতা ও উৎসাহ আমাকে বারবার নতুন করে শুরু করার সাহস দিয়েছে। আজকের এই অর্জনের পেছনে ‘উইথ দ্য মাইন্ড’-এর বড় অবদান রয়েছে।’
আয়োজকরা জানান, ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালিত হলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় করতে নিয়মিত মিলনমেলা, কর্মশালা, সচেতনতামূলক সেমিনার এবং পারিবারিক বনভোজনের আয়োজন করা হয়। এসব উদ্যোগ প্রবাসী নারীদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কমানোর পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে জানানো হয়, আগামী দিনে ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত আরও বেশি বাংলাদেশি নারীকে ভাষা শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নতুন শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মসূচিও চালু করা হবে।
অনুষ্ঠানে ছিলেন কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তি আশরাফুল ইসলাম, ডা. হাবিবা জেসমিন, সাংবাদিক ফয়সাল আহমেদ দ্বীপ, সাংবাদিক ফেরদৌস করিম আখঞ্জী, সাংবাদিক মুমিন আনসারী, সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম রনি, তরুণ পেশাজীবী দিয়ান আশরাফ, পেশাজীবী ইয়াসমিন নাজু, সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ ফারজানা নুপুরসহ বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। শুভেচ্ছা বিনিময় ও নৈশভোজের মধ্য দিয়ে শেষ হয় তিন বছর পূর্তির অনুষ্ঠান।




