ধলেশ্বরী মেরে বুড়িগঙ্গায় স্বস্তি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘একূল ভাঙে ওকূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা’! এই খেলা শুধু নদীই না, খেলছে সরকারও। ঢাকার লাইফলাইনখ্যাত বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে ছিল মস্ত আয়োজন। বিপুল ব্যয়ে এই জলপ্রবাহের কিছুটা উন্নতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মরছে অন্য তটিনী। দখল-দূষণে ধুঁকছে সাভারের ধলেশ্বরী। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে ৯৩৭ কোটি টাকার প্রকল্পের সাফল্য নিয়েও।
বুড়িগঙ্গার সঙ্গে রাজধানীর হাজারীবাগের পরিবেশও কিছুটা উন্নত হয়েছে। অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে সাভার ট্যানারি এলাকার পরিবেশ-প্রতিবেশ। শুধু কি তাই? ‘চামড়া শিল্পনগরী, ঢাকা (চতুর্থ সংশোধিত)’ প্রকল্পটি ছিল তিন বছরের, কাজ শেষ হতে লেগেছে দেড় যুগ। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে খরচ। আরও আছে পদে পদে অদক্ষতা, অপরিকল্পনা ও অব্যবস্থাপনার ছাপ।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ১২ ধরনের দুর্বল দিক চিহ্নিত করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন। যদিও তা চূড়ান্ত হবে জুনে। এর আগেই তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রাথমিক এ রিপোর্ট এসেছে আগামীর সময়ের হাতে। তা পর্যালোচনা করে মিলেছে এসব তথ্য।
প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরির কথা নিশ্চিত করে আইএমইডির সাবেক সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন আগামীর সময়কে জানালেন, প্রতিবেদনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসবে। এটি চূড়ান্ত হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। অর্থাৎ, আইএমইডির সুপারিশগুলো অবশ্যই আমলে নিতে হবে। অন্যথায় মিলবে না মূল্যায়নের সুফলও।
আইএমইডি জানায়, সরকারের শিল্পায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং রপ্তানিমুখী চামড়াশিল্পের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে গৃহীত একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ অবকাঠামোগত প্রকল্প এটি। দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত ট্যানারি শিল্পের কারণে মরে যাচ্ছিল বুড়িগঙ্গা। নদীর পানি মারাত্মক দূষণের পাশাপাশি বায়ু ও মাটির দূষণ ঝুঁকিতে ফেলছিল জনস্বাস্থ্য। একই সঙ্গে চলে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত সমালোচনা।
এমন প্রেক্ষাপটে ট্যানারিশিল্পকে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তরের মাধ্যমে পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় চামড়াশিল্প নগরী স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার।
প্রকল্পটি মূলত ২০০৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৫ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে বাস্তবায়নের লক্ষ্য ছিল। সেই সঙ্গে ব্যয় ধরা হয় ১৭৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। কিন্তু দফায় দফায় সময় ও ব্যয় বেড়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত ১৮ বছর ৬ মাসে কাজ শেষ করতে খরচ হয় ৯৩৭ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনের খসড়ায় দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি), নর্দমা শোধনাগার (এসটিপি), কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা (এসডব্লিউএমএস), ডাম্পিং ইয়ার্ড, পানি শোধনাগার, অগ্নিনির্বাপণ কেন্দ্র, প্রশাসনিক ভবনসহ অতিরিক্ত অবকাঠামো সংযোজনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, যা প্রাথমিক পরিকল্পনায় ছিল অনুপস্থিত। ফলে সময় ও ব্যয়— উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। একই সঙ্গে প্রকল্পে ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) পরিবর্তন প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে এবং বাস্তবায়ন দেরি হওয়ার অন্যতম কারণ।
ধলেশ্বরী নদীর পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের জন্য কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) আউটলেট, আপস্ট্রিম এবং ডাউনস্ট্রিম এলাকা থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সমীক্ষার ফলে দেখা যায়, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের কারণে রাজধানীর দূষণ কিছুটা কমলেও সাভার এলাকায় নতুন ধরনের পরিবেশগত চাপ বাড়ছে।
স্থানীয় জনগণের মতে, ধলেশ্বরীর পানি দূষিত ও কালো হয়ে গেছে, বেড়েছে দুর্গন্ধ। জলজ প্রাণীর উপস্থিতি কমার সঙ্গে ঊর্ধ্বমুখী বায়ুদূষণ। সিইটিপি স্থাপন করা হলেও এর কার্যকারিতা আংশিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। প্লান্টের নকশাগত সক্ষমতার তুলনায় অধিক বর্জ্যপ্রবাহ, অতিরিক্ত রাসায়নিক ও পানি ব্যবহার, কঠিন বর্জ্য সিইটিপি লাইনে মিশে যাওয়া, বিদ্যুৎ সংকট, দুর্বল অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে বর্জ্য শোধন কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। এতে জৈব রাসায়নিক চাহিদা (বিওডি), রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদা (সিওডি), মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ (টিডিএস), ক্রোমিয়াম ইত্যাদি পরিবেশগত মানদণ্ড অনেক ক্ষেত্রে অতিক্রম করছে নির্ধারিত সীমা।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অধিকাংশ ট্যানারি এখনো তা পূরণে ব্যর্থ। এর প্রধান কারণগুলো হলো পরিবেশগত অনুবর্তন ঘাটতি, ক্রোম পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা সীমাবদ্ধতা, শ্রমিক নিরাপত্তা এবং পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা মানদণ্ডের দুর্বলতা, পর্যাপ্ত বর্জ্য পৃথকীকরণের অভাব, কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের আংশিক কার্যকারিতা এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পর্যবেক্ষণ ও নথিপত্র ঘাটতি তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে।
মূল্যায়ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ট্যানারিগুলোর মধ্যে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সচেতনতা ও সমন্বয়ের ঘাটতিও লক্ষ করা গেছে। সমীক্ষায় অবৈধ আড়ত, মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা, কাঁচা চামড়া বাজারে অস্বচ্ছতা, প্রশাসনিক ভবনের ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু না হওয়া, রেন্টাল নীতিমালার অভাব, অডিট আপত্তি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কিছু অবকাঠামোর অপূর্ণ ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে স্লাজ ডাম্পিং ইয়ার্ড ও ক্রোম ব্লকের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এখনো নিশ্চিত হয়নি, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় পরিবেশগত ঝুঁকি।
কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, ট্যানারিতে ক্রোম পুনরুদ্ধার ইউনিট বাধ্যতামূলক করা, কঠিন বর্জ্য পৃথকীকরণ নিশ্চিত করা, নিরাপদ ল্যান্ডফিল ও সমন্বিত স্লাজ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং রিয়েল-টাইম ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু প্রয়োজন— সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
পাশাপাশি সব ট্যানারিতে কার্যকর প্রি-ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন, পরিবেশগত মানদণ্ডের কঠোর প্রয়োগ, নিয়মিত পরিবেশগত নিরীক্ষা এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ করতে এলডব্লিউজি সনদ অর্জনের লক্ষ্যে সময় সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা, সমান বন্ড সুবিধা, ক্রেতা-কারখানা সংযোগ এবং সরাসরি রপ্তানি ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। এ ছাড়া শ্রমিক স্বাস্থ্যসেবা, পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা মানদণ্ড, দক্ষ জনবল উন্নয়ন এবং সমন্বিত শাসনকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।




