বার্লিন মিশনে ‘স্পাই ক্যামেরা’ কেলেঙ্কারি
- দূতাবাসে অডিট টিমের কথোপকথন ও গতিবিধি রেকর্ড করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ

৩০ অক্টোবর, ২০২৪। জার্মানির বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাসে শুরু হয় তিন অর্থবছরের অডিট কার্যক্রম। দূতাবাসের বিভিন্ন ব্যয়, বাড়ি ভাড়া, শিক্ষা ভাতা, সফর খরচসহ সব হিসাবপত্র যাচাই করতে নেমে পড়ে অডিট টিম। অডিট শেষে জমা দেওয়া হয় প্রতিবেদনও। তাতে উঠে আসে মিশনের নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার চিত্র। এতে বেশ চাপের মধ্যে পড়ে যান মিশনের কর্মকর্তারা। কিন্তু অচিরেই পরিস্থিতি মোড় নিতে শুরু করে উল্টো দিকে। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কিছু জিনিস ছড়িয়ে পড়ে। এতে বেশ বিপাকে পড়ে যান অডিট টিমের সদস্যরাও। অডিট কাজ পরিচালনার সময় টিমের সদস্যদের ব্যক্তিগত নানা মুহূর্তের কথোপকথন ও বার্লিনে তাদের গতিবিধির ফুটেজ ছেড়ে দেওয়া হয় সাইবার দুনিয়ায়। এতে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে ভয়ানক বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যান অডিট টিমের সদস্যরা। অন্যদিকে মিশনের নানা অনিয়মের বিষয়টি কিছুটা হলেও চলে যায় আড়ালে। ‘ইটের বদলে পাটকেল’ মারার এমন নাটকীয় ঘটনার আদ্যোপান্ত জানা গেছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে।
জানা গেছে, অনিয়মে জড়িত মিশন কর্মকর্তারা তাদের গোমর ফাঁস হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে নানাভাবে অডিট টিমের সদস্যদের ম্যানেজ করার চেষ্টায় নামেন। কিন্তু তাতে সুবিধা না হওয়ায় টিমের সদস্যদের বিপাকে ফেলার ছক কষতে শুরু করেন। মিশন কার্যালয়ে পাতা হয় ‘স্পাই ক্যামেরা’ ফাঁদ। শুধু তা-ই নয়, অডিট টিমের সদস্যদের বহনকারী যানবাহনেও লাগানো হয় গোপন ক্যামেরা।
উল্লেখ্য, বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাসে সর্বশেষ এই অডিট টিমের নেতৃত্ব দেন পূর্ত অডিট অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক সোহেল আহমেদ। মিশনের গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি তিনি গত ১৩ মে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে লিখিতভাবে জার্মানিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের বর্তমান রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ জুলকারনাইনকে অবহিত করেন। ওই চিঠিকে কেন্দ্র করে এখন কূটনৈতিক অঙ্গনে চলছে সরব আলোচনা।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের মাধ্যমে চিঠিটি আগামীর সময়ের হাতে এসেছে। সোহেল আহমেদের চিঠিতে বলা হয়, অডিট টিমের সদস্যরা যে কক্ষে (বার্লিনে) কাজ করতেন, সেই কক্ষের সিলিংয়ে গোপনে ক্যামেরা বসানো হয়। স্টাফ কারেও স্থাপন করা হয় বিশেষ ডিভাইস। টিমের সদস্যদের ব্যক্তিগত আলাপ, এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনের কথাবার্তাও করা হয় রেকর্ড। সবকিছুর সমন্বয় করেন তৎকালীন কাউন্সিলর (বর্তমানে আবুধাবি বাংলাদেশ মিশনে কর্মরত) তৌহিদ ইমাম। সহযোগী হিসেবে ছিলেন হিসাবরক্ষক রেজাউল করিম।
সোহেল আহমেদ ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে আগামীর সময়কে বললেন, ‘বার্লিনে অডিট কার্যক্রম শুরুর পর তখনকার রাষ্ট্রদূত মোশাররফ ভূঁইয়া, কাউন্সিলর সাইফুল ইসলাম, কাজী তুহিন রসুল, তৌহিদ ইমাম ও রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অডিট মেমো ইস্যু করা হয়। এরপর থেকেই তারা ব্যক্তিগতভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে খাটাতে শুরু করেন নানা অপকৌশল। অডিট টিমের সদস্যদের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের জন্য উৎসাহিত করেন, যাতে গাড়িতে লাগানো ক্যামেরায় তাদের চলাচল ও কথাবার্তা রেকর্ড করা যায়। কিছুদিন পর দূতাবাসের ভেতরে-বাইরে ধারণ করা এসব ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো লিখিত অভিযোগ, রাষ্ট্রদূতের অফিসিয়াল চিঠি এবং নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বার্লিন মিশনের তৎকালীন কাউন্সিলর কাজী তুহিন রসুলকে ঘিরে কয়েক বছর ধরে চলছিল বিতর্ক। অডিট শুরু হওয়ার পর সেগুলো প্রকাশ্যে আসে। উঠে আসে শিশু শিক্ষা ভাতায় অসংগতি, টিকিট কেনায় নিয়ম লঙ্ঘন, সরকারি সফরে অতিরিক্ত ব্যয়, অনুমোদন ছাড়া লেনদেন ও ব্যক্তিগত কাজে সরকারি অর্থ খরচের অভিযোগ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ এ প্রসঙ্গে আগামীর সময়কে বললেন, বিষয়টি অনেক স্পর্শকাতর। যদি এমন হয়ে থাকে তবে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রকৃত ঘটনা জানতে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
এক দাপ্তরিক নথি থেকে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রদূত মোশাররফ ভূঁইয়ার লেখা চিঠিতে কাউন্সিলর কাজী তুহিন রসুলের বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়। বলা হয়, তিনি বাসার চুক্তিপত্রে জালিয়াতির মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ তুলে আত্মসাত করেছেন। বার্লিনে তার বাসা ভাড়ার অর্থ পরিশোধের জন্য যে ব্যাংক হিসাব দূতাবাসে জমা দেওয়া হয়েছিল, সেটি কোনো প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির নয়। যাচাই-বাছাইয়ে ধরা পড়ে সেটি কাজী তুহিন রসুলের স্বামী তানভীর মাহমুদের অ্যাকাউন্ট। রাষ্ট্রদূত তার চিঠিতে উল্লেখ করেন, তুহিন রসুলের জমা দেওয়া কাগজপত্র ছিল মিথ্যা ও জাল।
চিঠিতে বলা হয়, ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত ৪৬ মাস সরকারি বাসা ভাড়ার অর্থ ব্যক্তিগত হিসাবে নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ৭৯ হাজার ১৪৯ ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯২ লাখ টাকা) আত্মসাৎ করা হয়েছে। তিন কর্মদিবসের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয় তুহিন রসুলকে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত উত্তোলিত অর্থ সরকারি হিসাবে ফেরত দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। মনে করা হচ্ছে, রাষ্ট্রদূতের এই চিঠির সঙ্গে পরবর্তী সময়ে অডিট টিমকে ঘিরে যেসব অপকর্মের ঘটনা ঘটেছে, তার যোগসূত্র রয়েছে।
জার্মানির ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আইন অত্যন্ত কঠোর। অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত আলাপ রেকর্ড করা হলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মিশন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে স্থানীয় আইনে ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কাজী তুহিন রসুলের মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও জবাব দেননি তিনি।
বর্তমান রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ জুলকারনাইনও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
তৎকালীন রাষ্ট্রদূত মোশাররফ ভূঁইয়া গত শুক্রবার মোবাইল ফোনে আগামীর সময়কে বললেন, ‘যে ঘটনার কথা বলা হচ্ছে, ওই সময় আমি কর্মস্থলে ছিলাম না। অডিট শুরুর আগেই দেশে চলে এসেছিলাম।’ এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।
আরেক কর্মকর্তা তৌহিদ ইমামকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ না করে মেসেজ পাঠিয়ে জানান, তিনি এসব ঘটনার বিষয়ে কিছু জানেন না; বরং অডিট টিমের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অডিট টিমের প্রধান সোহেল আহমেদ শুক্রবার জানান, পুরো ব্যাপারটি খতিয়ে দেখতে গত বছরের এপ্রিলে বার্লিনে পাঠানো হয় কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্সের কর্মকর্তা শামসুর রহমানকে। তিনি অডিট টিমের বিরুদ্ধে মিশন কর্মকর্তাদের অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পাননি। চলতি বছরের এপ্রিলে বার্লিনের ঘটনাটি খতিয়ে দেখার পর একই তথ্য দিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ফারমীন মাওলাও। সে সঙ্গে তিনি দূতাবাসের অভ্যন্তরে স্পাই ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়টিও নিশ্চিত করেন।




