মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে নতুন ভবিষ্যতের আশা

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং সুখবর নিঃসন্দেহে। তিনি একজন ভালো রাজনীতিবিদ এবং সুস্থ ধারার রাজনীতি করেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জ্ঞানী ব্যক্তি। তার হাতে দেশের নেতৃত্ব যাওয়ায় ভবিষ্যতের জন্য এবং রাজনীতির জন্যও ভালো। তার নেতৃত্বে নতুন ভবিষ্যৎ পাবে দেশের মানুষ। তিনি একজন শিক্ষাবিদ, অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও সজ্জন ব্যক্তি। তার এই নতুন দায়িত্ব গ্রহণ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির মর্যাদা আরও সমুন্নত করবে। আলমগীরকে যদি সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করি, তাহলে তার দুটি দিক বিশেষভাবে মনে পড়ে— একটি তার মানবিকতা, অন্যটি রাজনৈতিক চেতনা। পরোপকারের মানসিকতা তার প্রবল। ছাত্র হিসেবেও সে বেশ ভালো ছিল।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে আমার পরিচয় আজকের নয়; সেই পরিচয় ছয় দশকের বেশি পুরনো। ১৯৬৩ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় যে সম্পর্কের শুরু, তা পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবন, ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনের নানা বাঁক পেরিয়ে আজও অটুট রয়েছে। তাই আজকের মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে যখন দেখি, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে ষাটের দশকের সেই তরুণ আলমগীর— সংবেদনশীল, বন্ধুবৎসল, মানুষের প্রতি গভীর দরদসম্পন্ন এবং দেশের প্রতি প্রবল দায়বোধে উজ্জীবিত এক ছাত্র। ১৯৬৩ সালে আমি ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। আমি ছিলাম সায়েন্সের ছাত্র, আলমগীর ছিল আর্টসে। সেই সূত্রেই প্রথম তার সঙ্গে পরিচয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে আমরা একই ব্যাচে ভর্তি হই। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, মির্জা আলমগীরসহ আমরা অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ একটি ব্যাচ পেয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আমাদের যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হয় এবং ছাত্ররাজনীতি আমাদের সম্পর্ককে আরও কাছে নিয়ে আসে।
আমরা তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (এপসু), যা পিকিংপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিল, তার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আলমগীর ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এপসু ইউনিটের সভাপতি।
১৯৬৯-এর আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে ছাত্ররা যখন রাজপথে, আমরা তখন একসঙ্গে মিছিলে হাঁটতাম। শহীদ আসাদের রক্তে রঞ্জিত রাজপথের সেই উত্তাল দিনগুলোয় আলমগীর ছিল সামনের সারিতে। অনেক হামলা, নির্যাতন ও রাজনৈতিক সহিংসতার শিকারও হতে হয়েছে তাকে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছিল যে তার শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একপর্যায়ে তাকে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে হয়।
ছাত্রজীবন শেষে আমাদের পথ কিছুটা বদলে যায়। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিই আর আলমগীর বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে সরকারি কলেজে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করে। পরে সে শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিকে পূর্ণাঙ্গ পথ হিসেবে বেছে নেয় এবং দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থানে পৌঁছায়।
আজ এত বছর পর পেছনে তাকালে যে ছবিটা আমার ভেসে ওঠে, তা কোনো রাজনৈতিক মঞ্চের নয়; বরং রাজপথের সেই তরুণ সহপাঠীর— যে বন্ধুদের প্রতি আন্তরিক, মানুষের কষ্টে ব্যথিত এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে প্রস্তুত। সময় বদলেছে, দায়িত্ব বদলেছে— কিন্তু ষাটের দশকে তার মধ্যে যে সংবেদনশীলতা ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার বীজ দেখেছিলাম, সেটাই তাকে আজকের পরিপক্ব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।






