পিত্রালয়েও নারীর প্রতি সহিংসতা, ৬৮ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার

সংগৃহীত ছবি
নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু স্বামীর বাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়, বাবার বাড়িতেও প্রায় ৬৮ শতাংশ নারী সহিংসতার শিকার হন বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। শৈশব থেকেই অনেক মেয়ের চলাফেরা, বন্ধুর বাড়িতে যাওয়া, বাইরে কাজ করা কিংবা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সীমিত করে দেওয়া হয়। সময়ের সঙ্গে পরিবারের এই নিয়ন্ত্রণ সমাজে স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
‘পিত্রালয়: নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতার এক উপেক্ষিত ক্ষেত্র’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানে উঠে আসে এসব তথ্য। সোমবার রাজধানীর লালমাটিয়ায় এনজিও ফোরামে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে প্রাগ্রসর।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য দেন ভারতের নারীবাদী অধিকারকর্মী ও ‘স্বয়ম’-এর প্রতিষ্ঠাতা অনুরাধা কাপুর। পিত্রালয়ে নারীর প্রতি সহিংসতার ধরন, এর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপট এবং প্রতিরোধে নীতিগত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
অনুরাধা কাপুর বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতাকে আমরা প্রায়ই শুধু স্বামীর বাড়ির নির্যাতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখি। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৬৮ শতাংশ নারী বাবার বাড়িতেও সহিংসতার শিকার হন।’
তার ভাষ্য, বাবা-মা, ভাইসহ পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে চরিত্র নিয়ে অপবাদ, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, মারধর এবং সম্পত্তির অধিকার চাইলে সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকির মতো ঘটনাও ঘটে। এমনকি স্বামীর বাড়িতে নির্যাতনের শিকার হলেও অনেক নারীকে বাবার বাড়িতে ফিরে আসতে দেওয়া হয় না। বরং তাদের ‘মানিয়ে নেওয়ার’ পরামর্শ দেওয়া হয়। এভাবে পিত্রালয়ে নারীর প্রতি সহিংসতাকে অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক করে তোলা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পরিবারে বাবা-মায়ের সম্পর্ক খারাপ হলে সন্তানের ওপর নির্যাতনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেক নারী শৈশবের সহিংসতাকে দীর্ঘদিন সহিংসতা হিসেবে চিনতেই পারেন না। কারণ এসব আচরণ সমাজে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে গেছে।
তবে অনুরাধা কাপুর বলেন, অনেক নারী এসব পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, নিজস্ব কৌশলে তা মোকাবিলা করেছেন এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পথ খুঁজে নিয়েছেন।
ইউ ক্যানের নির্বাহী পরিচালক জিনাত আরা হক বলেন, ‘সমাজে আমরা ‘বাবার বাড়ি’ বলি, কিন্তু ‘মায়ের বাড়ি’ বলি না। এই ভাষাই নারীর অধিকারহীনতার বাস্তবতাকে প্রকাশ করে।’ ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের শেখানো হয়, জমি-সম্পত্তি তাদের বিষয় নয়; তাদের ভূমিকা কেবল গৃহস্থালির কাজে সীমাবদ্ধ। এই বৈষম্যের মধ্য দিয়েই অনেক নারী নিজেকে দ্বিতীয় লিঙ্গ হিসেবে ভাবতে শেখেন।
তিনি বলেন, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সহিংসতামুক্ত করতে হবে। আর সেই পরিবর্তনের শুরু হতে হবে পরিবার থেকেই।
উত্তরাধিকার ও বৈষম্যের প্রসঙ্গে নারী প্রগতি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শাহানাজ সুমি জানান, পরিবারে সম্পত্তিতে সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে অনেক মেয়ের ভাগ্য যেন আগেই নির্ধারিত হয়ে যায়। শৈশব থেকেই তারা জীবনের নানা ক্ষেত্রে কম সুযোগ, কম গুরুত্ব ও কম অধিকার পেতে পেতে বড় হয়।
তিনি বলেন, ‘এই বৈষম্যকে আর স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে না। কেন একজন মেয়ের সঙ্গে বৈষম্য করা হচ্ছে, কেন তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, কেন তার প্রতি নির্যাতন হচ্ছে, এসব প্রশ্ন এখনই জোরালোভাবে তুলতে হবে।’ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পরিবার থেকেই সচেতনতা, প্রতিবাদ ও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তারা বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি শুধু বৈবাহিক পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দেখলে সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়ালে থেকে যায়। পিত্রালয়েও নারীরা বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হতে পারেন। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বৈবাহিক পরিবারের পাশাপাশি পিত্রালয়কেও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রাগ্রসরের নির্বাহী পরিচালক ফওজিয়া খোন্দকার বলেন, পিতৃতন্ত্র অনেক সময় অদৃশ্য কাঠামো হিসেবে কাজ করে। এর ভেতর থেকেই নারীর প্রতি নানা ধরনের নির্যাতন ও বৈষম্য তৈরি হয়।
তিনি জানান, গবেষণা অনুযায়ী প্রায় ৬৮ শতাংশ নারী শারীরিক এবং ৭২ শতাংশ নারী মানসিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তার মতে, এসব সহিংসতা নিয়ে আরও বেশি কথা বলা জরুরি। পরিবর্তনের জন্য শুধু অন্যদের করণীয়ের দিকে তাকিয়ে না থেকে প্রত্যেককে নিজের অবস্থান থেকে প্রশ্ন তোলা, সচেতনতা তৈরি করা এবং প্রতিরোধের উদ্যোগ নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। অধিকারকর্মী, শিক্ষার্থী, উন্নয়নকর্মী, গবেষক, শিক্ষক, নারী আন্দোলনের কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা পিত্রালয়ে নারীর প্রতি সহিংসতার বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন।
প্রাগ্রসর মনে করে, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে পিত্রালয়ের ভূমিকাকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, গবেষণা, নীতিগত উদ্যোগ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা জোরদার করার মাধ্যমে নারীর জন্য আরও নিরাপদ পারিবারিক পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।




