প্রধানমন্ত্রী
শুধু কাগজ দেখিয়েই গায়েব ৩৫০০ কোটি টাকা

ফাইল ছবি
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো কাজ না করে শুধু কাগজ দেখিয়েই হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের প্রতিটি খাতকে ভঙ্গুর ও বিধ্বস্ত অবস্থায় পেয়েছি।’
আজ সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ‘পুলিশ সপ্তাহ’ উপলক্ষে পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘অডিটর জেনারেলের রিপোর্টে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। রূপপুর প্রকল্পে প্রতিটি বালিশের দাম ধরা হয়েছে ৮০ হাজার টাকা এবং ড্রেসিং টেবিলের দাম ধরা হয়েছে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। পার্শ্ববর্তী দেশে সমমানের একটি প্রকল্প করতে যেখানে ১৪ হাজার কোটি টাকা লেগেছে, সেখানে রূপপুরে খরচ দেখানো হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা।’
কর্ণফুলী টানেল প্রসঙ্গে সরকারপ্রধান বলেছেন, ‘টানেলের ওপারে কোনো প্রয়োজন ছাড়াই বিলাসবহুল ভবন নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে শত শত কোটি টাকা। দুপাশে গাছ লাগানোর নামে ৫০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হলেও কোনো গাছ পাওয়া যায়নি অডিটে।’
পিরোজপুরের উদাহরণ টেনে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, শুধু কাগজ দেখিয়ে কোনো কাজ না করেই গায়েব করে দেওয়া হয়েছে এলজিআরডির ৩৫০০ কোটি টাকা। জেলার কয়েকটি দপ্তর মিলিয়ে লোপাটের তথ্য পাওয়া গেছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা।
পদ্মা সেতুর ব্যয় প্রসঙ্গে তারেক রহমানের মত, ‘পার্শ্ববর্তী দেশে ভূপেন হাজারিকা সেতু নির্মাণে ১৪-১৫ হাজার কোটি টাকা লাগলেও পদ্মা সেতুতে ব্যয় হয়েছে ৫৪-৫৬ হাজার কোটি টাকা। এই অপ্রয়োজনীয় খরচগুলো না হলে পুলিশ, সেনাবাহিনী, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আমরা অনেক ভালো কিছু করতে পারতাম। দুর্নীতিবাজদের এই ঋণের বোঝা এখন দেশের ২০ কোটি মানুষের ওপরে পড়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী যেসব অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেছেন তার প্রায় সবই ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প। ওই সময়ই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল এসব প্রকল্প নিয়ে। এর মধ্যে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের দুর্নীতির খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে শুরু হয় তোলপাড়। এ নিয়ে তদন্তে নেমেছিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। তৎকালীন পূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম সাংবাদিকদের ডেকে তদন্ত প্রতিবেদন তুলে দিয়েছিলেন তাদের হাতে। যেখানে মিলেছিল অভিযোগের সত্যতা।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই নিজের কোটিপতি পিয়নের পরিচয় সামনে এনেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওইদিন গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার বাসায় কাজ করেছে, পিয়ন ছিল সে, এখন ৪০০ কোটি টাকার মালিক। হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না। কী করে বানাল এত টাকা? জানতে পেরে ব্যবস্থা নিয়েছি।’
পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতির নানা ফিরিস্তি দিয়ে বলেছেন, ‘ক্যাবিনেট সদস্যদের জ্বালানি তেলের বরাদ্দ আমরা ৩০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছি। তবে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস বা চিকিৎসার মতো জরুরি সেবার ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল থাকবে।’
দুর্নীতি ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে পুলিশের পদোন্নতি, পদায়ন, নির্বাচনী ইশতেহার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ উঠে আসে। পুলিশ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীদের অপরাধী হিসেবেই দেখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দমনে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় আপনাদের রাজনৈতিক প্রভাবের মুখোমুখি হতে হয়। আপনারা দায়িত্ব পালন করবেন রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে।’ সরকার দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দুঃশাসনের সঙ্গে কোনো আপস করতে চায় না বলে সাফ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেছেন, ‘এ মুহূর্তে সারা দেশের মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আপনারা সরাসরি ভূমিকা রাখছেন। অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে পালনে সক্ষমতার পরিচয় দিলে বর্তমান সরকারও নিরাপদ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে একধাপ এগিয়ে যাবে। সীমাবদ্ধতা থাকলেও সক্ষমতা অনুযায়ী এগিয়ে যেতে পারলে আমরা সফল হব।’
সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছরের, জনপ্রশাসনের কোনো পদও চিরস্থায়ী নয়- বিষয়টি উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেন তিনি। একটি সরকারের সাফল্যের জন্য দক্ষ এবং নিরপেক্ষ পুলিশের বিকল্প নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিপদে পড়লে মানুষ প্রথমে পুলিশের কাছেই যায়। পুলিশ চাইলে আইনি এবং কৌশলী ভূমিকা নিয়ে অনেক ঘটনা শুরুতেই নিষ্পত্তি করতে পারে।’ গত দেড় বছরে বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতিতে এবং অনেক ক্ষেত্রে মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ইতিবাচক ভূমিকার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।
পুলিশ সপ্তাহের তৃতীয় দিনে আজ আইজিপির সঙ্গে বৈঠক করবেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এদিন বাছাইকৃত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিভিন্ন পদক প্রদান করা হবে বলে জানা গেছে।





