অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
ফেসবুকে ক্ষতিকর কনটেন্টে বাংলাদেশে সহিংসতার ঝুঁকি

ফেসবুকের ক্ষতিকর কন্টেন্ট বাংলাদেশে বাস্তব জীবনে সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করে বলছে, মেটা যদি এসব কন্টেন্ট মোকাবেলায় সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয় তবে বাংলাদেশ আরও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটতে পারে। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ সতর্কবার্তা দিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। গত ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অনলাইনে ক্ষতিকর কনটেন্টের পরিমাণ বেড়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অনলাইনে ক্ষতিকর কনটেন্টের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও অন্যদের নজরে আসে। এসব কনটেন্টের কিছু কিছু বাংলাদেশের বাইরে থেকে ছড়ানো হয়েছিল। এসব কনটেন্টের মধ্যে রাজনৈতিক দল ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ঘিরে বিভ্রান্তিকর ও উসকানিমূলক তথ্য, এবং ধর্মীয় বা সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিভাজন বাড়িয়ে তোলে এমন কন্টেন্ট। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাইরে থেকে আসা এসব কনটেন্টের বেশির ভাগই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে এসেছিল। সামগ্রিকভাবে এসব কনটেন্ট সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, বৈষম্য ও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো এই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে কিছু গণমাধ্যমের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন ঘটনা এমন এক বিপজ্জনক প্রবণতাকে তুলে ধরে, যা বিশ্বের আরও একাধিক দেশে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এসব ঘটনায় অনলাইনে উসকানি, ভুল তথ্য, অপতথ্য এবং পরিকল্পিত হয়রানিমূলক প্রচারণা দ্রুতই অফলাইনে (বাস্তবে) ছড়িয়ে বৈষম্য, সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনায় রূপ নিতে পারে, বিশেষ করে প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম যখন এ ধরনের কনটেন্টকে আরও উসকে দেয়।
এ বিষয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ‘বিগ টেক অ্যাকাউন্টিবিলিটি’ বিভাগের প্রধান আলিয়া আল ঘুসেইন বলছেন, ‘বাংলাদেশ এখনো মানবাধিকার সংকটে নেই, তবে সতর্কসংকেতগুলো স্পষ্ট। দেশ ও দেশের বাইরের ক্ষতিকর কনটেন্ট, রাজনৈতিক উত্তেজনা, সাম্প্রদায়িক বয়ান এবং অ্যালগরিদমিক প্রচারের সমন্বয় এমন এক অস্থির পরিবেশ তৈরি করছে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকারকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।’
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম সারির দুটি সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কার্যালয়ে সহিংস মব (উচ্ছৃঙ্খল জনতা) হামলা চালায়। ডেইলি স্টার ও স্থানীয় তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হামলার কয়েক মাস আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ দুটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে নানা হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে ওই দুই সংবাদমাধ্যমকে “ভারতের এজেন্ট” ও “দেশবিরোধী শক্তি” হিসেবে আখ্যা দেন। এসব পোস্টে সংবাদমাধ্যমদুটির অফিসে হামলা ও আগুন দেওয়ার আহ্বানও ছিল। ডেইলি স্টার ও ডিসমিসল্যাবের তদন্তে অনলাইনে সহিংসতার উসকানি এবং বাস্তবে হামলার মধ্যে সরাসরি সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অ্যামনেস্টি বলছে, সহিংসতার উসকানি দেওয়া পোস্টগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বিলম্বের বিষয়ে মেটাকে সতর্ক করেছে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে জননিরাপত্তা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর এর প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উদ্বিগ্ন যে এই ধরনের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। এর আগেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে অনলাইন অপতথ্যের বিভেদমূলক ভূমিকার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এসব অপতথ্যের মধ্যে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও অতিরঞ্জিত তথ্য ছড়ানোর মতো বিষয় রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে ভারত থেকে আসা কনটেন্টও রয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার তথ্যমতে, এসব অনলাইন কনটেন্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভীতি ও উত্তেজনা বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
আলিয়া আল ঘুসেইন বলেন, ‘ঝুঁকিটা এখানে একেবারেই স্পষ্ট। অনলাইনের ক্ষতি শুধু ডিজিটাল জগতেই আটকে থাকে না। এগুলো মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে ভূমিকা রাখে, উত্তেজনা উসকে দিতে পারে এবং বাস্তব জীবনে সহিংসতা ও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।’
আলিয়া আল ঘুসেইন আরও বলেন, ‘এসব প্রতিরোধ করা এবং এ ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর ক্ষমতার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার এখনই উপযুক্ত সময়। ক্ষতিকর অনলাইন কনটেন্ট কীভাবে বাস্তব জীবনে সহিংসতা ছড়িয়ে দিতে পারে, তা বিশ্ববাসী বারবার দেখেছে। বাংলাদেশে সেই ধারা বন্ধ করার সুযোগ এখনো রয়েছে এবং এখন ব্যবস্থা নেওয়াটা মেটার ওপর নির্ভর করছে।’

