শেষ বিকালের যে প্রেম গড়াল মৃত্যুতে
- ভালোবাসার মানুষটিই তানজিলার ঘাতক
- যে হাত ধরেছিল ভালোবাসার জন্য সেই হাতই কেড়ে নিল তানজিলার জীবন

তানজিলা
প্রেম কখনো হাত ধরে মানুষকে স্বপ্নের কাছে নিয়ে যায়, আবার কখনো সেই হাতই ঠেলে দেয় জীবনের শেষ অন্ধকারে। যে মানুষটির সঙ্গে ছোট ছোট লাল-নীল রঙিন স্বপ্ন বুনেছিল ১৭ বছরের কিশোরী তানজিলা, শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটির হাতেই থেমে গেল তার সব স্বপ্ন, সব পথচলা। ঘুরতে বের হওয়া সাধারণ বিকাল আর ফিরে আসেনি সন্ধ্যার আলো হয়ে। ফিরে এসেছিল শুধু একটি নিথর দেহ— গলায় গভীর ক্ষত, চারদিকে রক্তের দাগ আর অসংখ্য না বলা প্রশ্ন। তানজিলা নীরবে বলে গেল— কিছু সম্পর্কের শেষ হয় বিচ্ছেদে, আর কিছু শেষ হয় রক্তাক্ত ট্র্যাজেডিতে।
প্রতিদিনের মতো গত সোমবারও প্রেমিক রানা হাওলাদারের সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছিল তানজিলা। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা, তারপর রাত নেমে এলেও আর বাড়ি ফেরা হয়নি তার।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি নির্জন হাউজিং এলাকায় অটোরিকশা থামার পর মুহূর্তেই বদলে যায় তাদের সম্পর্কের শেষ অধ্যায়। ভালোবাসার জায়গা দখল করে নেয় তর্ক, ক্ষোভ আর জমে থাকা অভিমান। সেই কথাকাটাকাটিই একপর্যায়ে রূপ নেয় নির্মম হত্যাকাণ্ডে।
তদন্তে জানা গেছে, প্রথমে তানজিলার গলা চেপে ধরেন রানা। মেয়েটি নিস্তেজ হয়ে পড়লেও সে বেঁচে থাকতে পারে— এই আশঙ্কায় সঙ্গে থাকা একটি ছোট ফল কাটার চাকু দিয়ে তার গলা কেটে দেন তিনি। এরপর তানজিলার গলার রুপার চেইন, হাতের ব্রেসলেট এবং দুটি মোবাইল ফোন নিয়ে রাতের আঁধারেই বাড়ি ফিরে যান।
নিখোঁজ হওয়ার পরদিন মঙ্গলবার সকালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের মদিনানগরের একটি ফাঁকা হাউজিং প্লট থেকে গলাকাটা অবস্থায় তানজিলার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলে গিয়ে মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন তার মা। পরে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়।
তবে হত্যাকারীকে শনাক্ত করতে বেশি সময় লাগেনি। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হত্যার রহস্য উদঘাটন করে পিবিআই ঢাকা জেলা। গত বুধবার ভোররাতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তানজিলার প্রেমিক রানা হাওলাদারকে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার করা হয় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাকু, তানজিলার দুটি স্মার্টফোন, রুপার চেইন ও ব্রেসলেট। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার কথা স্বীকার করার পর আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন তিনি।
পিবিআইর তদন্তে উঠে এসেছে, তানজিলার সঙ্গে অটোরিকশাচালক রানার পরিচয় চলার পথে। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয়। ছয়-সাত মাস ধরে তারা প্রেম করছিল। প্রায়ই রানার অটোরিকশায় ঘুরতে বের হতো তানজিলা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কেই জমতে থাকে দূরত্ব, অভিমান ও আর্থিক টানাপড়েন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, স্ত্রীর সঙ্গে আগেই বিচ্ছেদ হয়েছিল রানার। ওই সংসারে তার ছোট ছেলে এখন দাদির কাছে থাকে। অটোরিকশা চালিয়ে প্রতিদিন এক-দেড় হাজার টাকা আয় করলেও তার বড় অংশই জমা দিতে হতো গাড়ির মালিককে। বাকি অর্থ দিয়ে মা ও সন্তানের পাশাপাশি তানজিলার পেছনেও নিয়মিত খরচ করতেন তিনি। এতে আর্থিক চাপ বাড়তে থাকে।
এদিকে সামনে ছিল তানজিলার এক আত্মীয়ের বিয়ে। কেনাকাটার জন্য সে রানার কাছে ৩০ হাজার টাকা চায়। কিন্তু সেই টাকা জোগাড় করতে না পারায় রানা অস্বীকৃতি জানান। বিষয়টি নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। তদন্তে আরও জানা গেছে, তানজিলার অন্য কয়েকজন ছেলের সঙ্গেও বন্ধুত্ব ও ঘোরাঘুরি নিয়ে রানার মধ্যে সন্দেহ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সব মিলিয়ে সম্পর্কটি ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছিল।
সোমবার দুপুরে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বাঘৈরে খালার বাসায় দুপুরের খাবার খেয়ে বিকালে নিজ বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয় তানজিলা। এর পর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সাইদুল হক জানিয়েছেন, ২৭ জুলাই বিকালে খালার বাসা থেকে বেরিয়ে তানজিলা রানাকে ফোন করে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে। কিছুক্ষণ পর রানা অটোরিকশা নিয়ে এসে তাকে তুলে নেন। এরপর তারা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের মদিনা মসজিদসংলগ্ন গ্রিন সোনার বাংলা হাউজিং এলাকার একটি নির্জন স্থানে যান। সেখানেই ৩০ হাজার টাকা এবং সম্পর্কের নানা বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে বাগ্্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে রানা তানজিলাকে হত্যা করেন।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ বলেছেন, ঘটনার পরপরই ক্রাইম সিন টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত শুরু করে। পরে স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাটি অধিগ্রহণ করা হয়। প্রযুক্তিগত তথ্য ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।






