কমেছে সহনশীলতা বেড়েছে উগ্রতা

সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর দোলাইরপাড় উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহরিয়ার সাঞ্জু। টিফিন শেষে হাঁটছিল রাস্তায়; হঠাৎ একই স্কুলের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী পথ আটকে বলে— ‘তুই আমাকে সিনিয়র হিসেবে সম্মান দিস না কেন?’ এরপর তর্কবিতর্কের একপর্যায়ে দশম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী তার পকেটে থাকা সুইচ গিয়ার চাকু দিয়ে আঘাত করে সাঞ্জুর পেটে। এতে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই কিশোর। গত ২৮ জুন দুপুরে ঘটে এ ঘটনা।
এর দুদিন আগে ২৬ জুন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে একদল কিশোর-তরুণকে প্রকাশ্যে সিগারেট খেতে নিষেধ করায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় ছয়জন হয় আহত। এর মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
গত ১৮ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে একদল কিশোর জেল খাটার অদ্ভুত শখ থেকে ১১ বছরের শিশু ফুল বিক্রেতা হোসাইনকে নিজেদের আড্ডাখানায় নিয়ে ছুরি দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করার পর পুলিশ জানিয়েছে, যে কিশোরদের রক্ত দেখলে ভয় পাওয়ার কথা, তাদের মনে জেল খাটার শখ থেকে এই খুন।
শুধু এই তিন ঘটনা নয়, বিকৃত মানসিকতার কারণে এখন প্রতিনিয়ত ঘটছে মারধর, খুনাখারাবি, ধর্ষণের মতো লোমহর্ষক অনেক অপরাধ। এক সময় স্কুল-কলেজের সামনে ইভটিজিং, পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার কিংবা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষেই সীমাবদ্ধ থাকত কিশোর-তরুণরা। এসব ঘটনায় সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠরাও ছিলেন সোচ্চার, অঘটনের খবর পেলেই আসতেন এগিয়ে, দ্রুত মিলত সমাধান। এখন দেখা যায় উল্টো চিত্র, চরম অবক্ষয় মূল্যবোধের।
‘সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের ধরন। পারিবারিক কলহ, লোভ, অহমিকা ও ব্যস্ততার কারণে খিটখিটে হয়েছে মেজাজ। সহ্য ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ঊর্ধ্বমুখী মানুষের অপরাধপ্রবণতা। এতে মানসিকতার সঙ্গে অবক্ষয় হচ্ছে মূল্যবোধের। যা ক্রমেই মানুষকে করে তুলছে অপরাধী। তাই এখন আর শুধু বখাটেপনা নয়, সংঘবদ্ধ খুন, ভয়ানক মাদকের কারবার, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, ছিনতাই, অপহরণ ও ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইলের মতো জঘন্য অপরাধেও জড়াচ্ছে সব শ্রেণি ও বয়সের মানুষ। যেন সামাজিক ব্যাধি’— মত অপরাধ বিশেষজ্ঞদের।
পারিবারিক অশান্তি, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণেও সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, ডিজিটাল প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার, মাদকের বিস্তার এবং যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে রূপান্তরের কারণে তীব্র হচ্ছে এসব সমস্যা। বাবা-মায়ের কাছ থেকে নৈতিক শিক্ষা না পাওয়া, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর অপব্যবহার, মাদকের সহজলভ্যতা, পরিবারে ও সমাজে একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থের টানাপড়েন দ্বন্দ্বে পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে। এর কারণে অনেকের মধ্যে মানসিকতার বিকৃত রূপ দেখা দিচ্ছে, মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে রোমহর্ষক অপরাধের পথে।
‘অনৈতিক সম্পর্ক ও সম্পত্তি ভাগাভাগির বিরোধসহ বিভিন্ন কারণে পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতা সমাজে তৈরি করছে অস্থিরতা। মনোমালিন্যকে কেন্দ্র করে পরিবারেই তৈরি হচ্ছে একাধিক পক্ষ। এতে তীব্র হচ্ছে রোমহর্ষক হত্যা বা আক্রমণ করার মানসিকতা। এ ছাড়া পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নৈতিক শিক্ষার অভাব, ঘটনা ঘটলে দৃশ্যমান বিচারের ঘাটতি, পারিবারিক শিক্ষা না পাওয়ার প্রতিফলন বর্তমান সমাজে’— আগামীর সময়কে ব্যাখ্যা করলেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক।
মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের কারণ তুলে ধরলেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ। তার দাবি, একজন মানুষ এমনিতেই ভয়ংকর ব্যক্তিত্বের হয় না। যখন অনেক ক্ষোভ একসঙ্গে যুক্ত হয় তখনই ঘটায় লোমহর্ষক ঘটনা। এর পেছনে রয়েছে স্কুল, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়।




