ব্রিকসে যুক্ত হলে বাংলাদেশের কী লাভ?

ছবি: এআই
ব্রিকসের সদস্য বা সহযোগী রাষ্ট্র হিসেবে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রাশিয়ার সক্রিয় সহায়তা ও সমর্থন চেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। সোমবার মস্কোতে রাশিয়ার সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ তুলে ধরেন। ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়ার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
বাংলাদেশের এই আগ্রহের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ব্রিকস। প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বের প্রভাবশালী এই জোটে যুক্ত হলে বাংলাদেশের কী লাভ হতে পারে?
ব্রিকস কী?
ব্রিকস বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ জোট। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে ‘ব্রিক’ শব্দটির উৎপত্তি। পরে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে এর নাম হয় ব্রিকস।
বর্তমানে জোটটির সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরান, মিসর, ইথিওপিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং ইন্দোনেশিয়া। বিশ্বের জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক উৎপাদন এবং জ্বালানি সম্পদের বড় একটি অংশ এই দেশগুলোর হাতে কেন্দ্রীভূত।
বাণিজ্যের নতুন সুযোগ
ব্রিকসে যুক্ত হলে বাংলাদেশের জন্য সদস্য দেশগুলোর বিশাল বাজারে প্রবেশের সুযোগ আরও সহজ হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া ও কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য নতুন বাজার খুঁজছে। ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার হলে রপ্তানি বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে চীন, ভারত, রাশিয়া, ব্রাজিল ও মধ্যপ্রাচ্যের বড় অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উন্নয়ন অর্থায়নের সুযোগ
ব্রিকসের অন্যতম বড় শক্তি হলো এর নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি)। এই ব্যাংক অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন এবং টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করে থাকে।
বাংলাদেশ ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে পারলে সড়ক, রেল, বন্দর, বিদ্যুৎ এবং জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পে নতুন অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক ঋণ ও বিনিয়োগের উৎসও বৈচিত্র্যময় হবে।
বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্ভাবনা
ব্রিকসভুক্ত দেশগুলো বিশ্বের বৃহৎ বিনিয়োগকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। জোটটির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হলে বাংলাদেশে শিল্প, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে।
বিশেষ করে চীন, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি যোগ করতে পারে।
কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হবে
ব্রিকস এখন শুধু অর্থনৈতিক জোট নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। জাতিসংঘ সংস্কার, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ব্রিকস সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
এই জোটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের মতামত তুলে ধরার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি উৎপাদক রাষ্ট্র রয়েছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহ, নবায়নযোগ্য শক্তি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং শিল্প সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
চ্যালেঞ্জও আছে
তবে ব্রিকসে যুক্ত হওয়া মানেই তাৎক্ষণিকভাবে সব সুবিধা পাওয়া নয়। সদস্যপদ বা সহযোগী রাষ্ট্রের মর্যাদা পেতে দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পাশাপাশি জোটের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিকসে যুক্ত হওয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বিকল্প বাড়ানো। উন্নয়ন অর্থায়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।
এ কারণেই বিশ্বের বহু দেশের মতো বাংলাদেশও এখন ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার পথ খুঁজছে এবং সেই লক্ষ্যেই রাশিয়ার সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করেছে।




