কেউ জানে না দেশে নদীর সংখ্যা কত

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটির সংবাদ সম্মেলন।
‘বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ, তবে এদেশে কতটি নদী আছে তা জানেন না কেউই। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারণ করা যায়নি নদীর সংখ্যা।’ আজ শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেছেন বক্তারা।
এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ‘প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটি’। সংগঠনটির মুখপাত্র ইবনুল সাঈদ রানার সঞ্চালনায় এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যার্সের সভাপতি পরিকল্পনাবিদ আরিফুল ইসলাম।
সংবাদ সম্মেলনে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় গত ৫৫ বছরে আমরা চরমতম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি। উন্নয়নের নামে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশকে রীতিমতো হত্যা করে ফেলেছি। পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন আমাদের অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে প্রতিনিয়ত ধাবিত করছে। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদসহ সবাই বিগত ৫৫ বছরে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশকে হত্যার উৎসবে সংযুক্ত ছিলেন।’
তার ভাষ্য, তথ্য অধিকার আইনে আমরা জানতে চেয়েছিলাম দেশে ইটভাটার সংখ্যা কত? পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে ইটভাটার সংখ্যা ৭ হাজার ৮৯৭টি। যার মধ্যে পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই ৫ হাজার ৯২টির। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমাদের জানিয়েছেন, উপজেলায় মোট ২১টি ইটভাটা আছে। যার মধ্যে একটিরও বৈধ অনুমোদন নেই। বন্ধের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সারা দেশে এভাবেই চলছে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ কার্যক্রম।
তিনি বলেছেন, ‘বর্তমানে এক হিসাবে দেশে নদীর সংখ্যা ২৪১০টি। তবে সরকারি হিসাবে ৪০৫টি, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ সংখ্যা ১৪১৫টি বললেও তা গেজেটভুক্ত হয়নি। ৫৫ বছর লেগে গেল শুধু নদীর সংজ্ঞা নির্ধারণে। আর কত বছর লাগবে সংখ্যা নির্ধারণে?’
সংবাদ সম্মেলনে লেখক ও নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেছেন, নদী নিয়ে জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের যে সনদটি আইনে পরিণত করা হয়েছে, তাতে আমারা অনুস্বাক্ষর না করলে পাশের দেশের সঙ্গে নদী আলোচনায় পিছিয়ে পড়ব। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হারিয়ে যাওয়া ৩০০ নদী খনন করেছেন। কিন্তু নদী দখলের সঙ্গে যুক্ত আমলা ও সুবিধাভোগীরা একে খাল খনন নাম দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করেছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প নিয়ে আরও ভাবতে হবে। নয়তো এটি আমাদের ইলিশ মাছ এবং বঙ্গোপসাগরে পলি দিয়ে ভূমি বৃদ্ধিকে ব্যাহত করবে। আমাদের পরিবেশ আইনটিও অসম্পূর্ণ। একে যুগোপেযোগী করতে হবে।
প্রাকৃতিক কৃষির দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, মানুষের শরীরে ৭৯ শতাংশ পুষ্টির ঘাটতি। তার মানে হলো, মাটিতে যা ঘাটতি, আমাদের শরীরেও তার ঘাটতি। গ্রামের বাজারগুলোতে এখন ২/৩টি করে প্রাণীর ফার্মেসি দেখা যায়। এর মানে হলো মানুষের পাশাপাশি এখন প্রাণীকুলের শরীরেও বিভিন্ন উপাদানের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের ডিন ও বিভাগীয়প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেছেন, বায়ু ও শব্দদূষণ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। এর ফলে গড় আয়ু কমছে। যে মাত্রায় শব্দদূষণ হচ্ছে তাতে নিকট-ভবিষ্যতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের একটা বড় অংশ শ্রবণ প্রতিবন্ধী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেছেন, বিভিন্ন উপকূলীয় নদীর পাশে পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করে ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ ধ্বংস করা হচ্ছে। এসব প্লান্টের বর্জ্য এবং রিফুয়েলিং ফেলা হচ্ছে নদীতে।
খাদ্যে হেভি মেটালের উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির প্রফেসর ড. সবুর আহমেদ। বলেছেন, ‘আশ্চর্যজনকভাবে আমরা বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে গিয়ে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে এখন তিনটি নদীকে দূষিত করছি।’
স্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক অধ্যাপক ড. ছায়েদুল হক বলেছেন, ‘বায়ু ও শব্দদূষণের ফলে দেশের শতভাগ মানুষ এখন পালস ও প্রেশারের রোগী। এ দুই দূষণের ফলে স্ট্রোক, হার্ট, ঘুমজনিত রোগ এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের রোগী দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান, বিজিএমইএ ফ্যাশন টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আব্দুল জলিল প্রমুখ।






