রেণু সিন্ডিকেটে উজাড় হচ্ছে নদী, বিলুপ্তির পথে দেশীয় মাছ

ছবি: আগামীর সময়
বরগুনার পাথরঘাটার বিষখালী ও বলেশ্বর নদী একসময় ছিল মাছের প্রাকৃতিক ভাণ্ডার। কিন্তু গত কয়েক বছরে নীরবে বদলে গেছে সেই চিত্র। গলদা ও বাগদা চিংড়ির রেণু পোনা আহরণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখন নদীর জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ এবং উপকূলীয় জনজীবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সিন্ডিকেট ভাঙা না গেলে পরিবেশ ও সমাজ উভয় ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
চৈত্র থেকে আষাঢ়— এই চার মাস নদীতে শুরু হয় চিংড়ির প্রাকৃতিক প্রজনন মৌসুম। ঠিক এই সময়েই সক্রিয় হয়ে ওঠে রেণু সিন্ডিকেট। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিদিন হাজার হাজার জেলে মশারি জাল নিয়ে নেমে পড়ছেন নদীতে। তাদের অধিকাংশই দরিদ্র জেলে পরিবার, নারী ও শিশু-কিশোর, দাদনের দুষ্টচক্রে জড়িয়ে নেমেছেন এ পেশায়।
সরেজমিনে পাথরঘাটার বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর তীর ঘুরে দেখা গেছে, ভোরের আলো ফোটার আগেই নদীতে সারি সারি নৌকা। মশারি দিয়ে তৈরি সূক্ষ্ম জাল দিয়ে সংগ্রহ করা হচ্ছে চিংড়ির রেণু পোনা। এই জালের ফাঁদ এত সূক্ষ্ম যে শুধু চিংড়ির রেণুই নয়, নদীর প্রায় সব প্রজাতির মাছের ডিম, লার্ভা ও ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী আটকা পড়ছে। পরে বাছাইয়ের সময় শুধু বাগদা বা গলদা রেণু আলাদা করা হয়। বাকি হাজার হাজার মাছের পোনা তীরে ফেলে দেওয়া হয় মৃত অবস্থায়। এ নিয়ে মৎস্য বিভাগ, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশ মাঝে মধ্যে অভিযান চালালেও বাস্তবে পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।
খোজ নিয়ে জানা যায়, রেণু শিকারিদের বড় অংশই আভাবগ্রস্থ মানুষ। মৌসুম শুরুর আগেই সিন্ডিকেটের লোকজন তাদের হাতে তুলে দেয় অগ্রিম টাকা, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘দাদন’। এই দাদনের বিনিময়ে জেলেদের রেণু বিক্রি করতে হয় নির্দিষ্ট আড়তে।
বলেশ্বর নদীর তীরে রেণু আহরণ করছিলেন হাফিজা নামে এক রেনু শিকারি। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, আমরা গরিব মানুষ, সংসার চালানোর জন্যই নদীতে নামতে হয়। মৌসুম শুরু হওয়ার আগে আড়ত থেকে দাদন নিয়েছি। এখন রেণু না ধরলে সেই টাকা শোধ করব কীভাবে? প্রতিদিন ভোর থেকে নদীতে কাজ করি, কিন্তু যে পরিশ্রম করি সেই তুলনায় আয় খুব বেশি নয়। অনেক সময় নদীতে আশানুরূপ রেণু পাওয়া যায় না। তারপরও সংসারের খরচ, ছেলে-মেয়ের পড়ালেখা আর নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে এই কাজ করতে হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, সরকার রেণু ধরতে নিষেধ করেছে জানি, কিন্তু বিকল্প কোনো কাজ বা আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই নদীতে নামি। যদি অন্য কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতাম, তাহলে ঝুঁকি নিয়ে নদীতে রেণু ধরতে আসতাম না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ রেণু শিকার শুধু পরিবেশগত ক্ষতির বিষয় নয়; এটি উপকূলীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক শোষণ ব্যবস্থাও। দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেটগুলো জেলে পরিবার, নারী ও শিশুদের দাদনের মাধ্যমে কাজে যুক্ত করছে। অগ্রিম অর্থ নেওয়ার পর শিকারিরা নির্দিষ্ট আড়তে কম দামে রেণু বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের হাতে, আর ঝুঁকি ও পরিশ্রম বহন করেন প্রান্তিক মানুষরা। বিকল্প কর্মসংস্থান, সামাজিক সহায়তা ও কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এই শোষণচক্র ভাঙা না গেলে পরিবেশ ও সমাজ উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হবে এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে রেণু ব্যবসার বিস্তৃত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক। মাঠপর্যায়ে শিকারিদের কাছ থেকে প্রতি পিস রেণু মাত্র দেড় থেকে দুই টাকায় কিনে নেওয়া হয়। একই রেণু পাইকারি পর্যায়ে বিক্রি হয় ৫ থেকে ১০ টাকায়। পাথরঘাটার চরদুয়ানী বাজারে অবস্থিত বড় আড়তগুলোতে প্রতিদিন ড্রামভর্তি রেণু জমা হয়। সেগুলো গভীর রাতে ট্রাক, পিকআপ ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে এসব রেণু পাঠানো হয় যশোর, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায়। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় ক্ষমতার বলয়ে পরিচালিত হচ্ছে এই অবৈধ বাণিজ্য। প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট নদীতে রেণু ধরা থেকে শুরু করে পরিবহন ও বিপণন পর্যন্ত পুরো চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে অভিযান হলেও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না এই কার্যক্রম।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিংড়ির রেণু ক্রয়কারী আড়তদার জানান, রেণু ব্যবসার সঙ্গে শুধু আড়তদাররা জড়িত নন, এর সঙ্গে হাজার হাজার দরিদ্র মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। অনেক পরিবার বছরের এই কয়েক মাসের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। চাহিদা থাকায় শিকারিরা রেণু সংগ্রহ করেন এবং আমরা তা কিনে বিভিন্ন চিংড়ি খামারে সরবরাহ করি।
পরিবেশকর্মী শফিকুল ইসলাম খোকনের মতে, অবৈধভাবে চিংড়ির রেণু আহরণ বর্তমানে উপকূলীয় নদ-নদীর জীববৈচিত্র্যের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি রেণু সংগ্রহের সময় অসংখ্য দেশীয় মাছের পোনা, ডিম ও অন্যান্য জলজ প্রাণী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে অনেক দেশীয় মাছ নদী থেকে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে এবং উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বলেছেন, ‘জনবল স্বল্পতা এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কারণে মাঠপর্যায়ে শতভাগ আইন প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। চলতি প্রজনন মৌসুমে রেণু আহরণ রোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলেও বিস্তৃত নদীপথ, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শিকারি এবং সংগঠিত সিন্ডিকেটের কারণে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় ব্যাহত হয়।’
তার মতে, শুধু অভিযান নয়, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মৎস্য বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া এই অবৈধ রেণু শিকার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাজেদুল হক বলেছেন, রেণু ব্যবসা শুধু একটি অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়, এটি মূলত একটি বহুমাত্রিক শোষণ ব্যবস্থার অংশ, যেখানে সংগঠিত সিন্ডিকেট দরিদ্রতা ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যবহার করছে। এই প্রক্রিয়ায় শিশু-কিশোর ও নারীদের খুবই স্বল্প মজুরিতে দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা সামাজিক ও মানবিক দিক থেকে গভীর উদ্বেগের বিষয়।
ড. সাজেদুল হক মনে করেন, শুধু প্রশাসনিক অভিযান বা বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। তার মতে, সমাজের সব স্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেই এই ধরনের শোষণমূলক সিন্ডিকেটকে কার্যকরভাবে রুখে দেওয়া সম্ভব।




