ছিনতাইয়ে অসহায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাত পৌনে ১১টা। অফিস শেষে অটোরিকশায় বাসায় ফিরছিলেন মির্জা রবিন। বাসা তখন মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ। কিন্তু সেই শেষ পাঁচ মিনিটই বদলে দেয় তার জীবন। রাজধানীর পল্লবীর পলাশনগরে আগে থেকেই ওত পেতে থাকা সাত-আট যুবক মুহূর্তেই রিকশা ঘিরে ফেলেন।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয় এলোপাতাড়ি কোপ। শরীরের ১৬টি স্থানে ছুরি মেরে সঙ্গে থাকা ৮০ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় তারা।
এর এক দিন পর গত ১৬ জুনের ঘটনা; রাত ১১টার দিকে মোটরসাইকেলে বাসায় ফিরছিলেন তরিকুল ইসলাম। আবদুল্লাহপুর ফ্লাইওভারে আরেকটি মোটরসাইকেলে এসে তার পথ আটকায় ছিনতাইকারীরা। তিনি চিৎকার করতেই বুকে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরি মেরে পালিয়ে যায় তারা। উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ দুটি ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। রাজধানীতে এখন প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে একই ধরনের হামলা। কোথাও ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে প্রাণ ঝরছে, কোথাও মোবাইল বা ব্যাগের হ্যাঁচকা টানে মানুষ রাস্তায় পড়ে গুরুতর আহত হচ্ছেন। বাধা দিলেই চলছে ছুরি কিংবা চাপাতির কোপ; এমনকি গুলিও। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সর্বস্ব হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। নগরবাসীর মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক— দিনের বেলায় অনেক ঘটনা ঘটলেও ঢাকার বহু এলাকা এখন রাত হলেই চলে যায় ছিনতাইকারীদের দখলে।
এমন উদ্বেগের প্রতিফলন মিলছে পুলিশের পরিসংখ্যানেও। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) হালনাগাদ তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীতে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা এখন ১ হাজার ৩৮৭ জন। মাত্র ছয় মাস আগে এই সংখ্যা ছিল ৯৮৯। অর্থাৎ, অর্ধবছরেই তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী বেড়েছে প্রায় দেড়গুণ। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, তালিকার বাইরে আরও হাজারো ভাসমান ও মাদকাসক্ত ছিনতাইকারী রাজধানীতে সক্রিয়।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রায় ৩০০টি ছিনতাইপ্রবণ এলাকা রয়েছে, যার মধ্যে ৫৫টি ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত। সবচেয়ে বেশি তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী রয়েছে ওয়ারী বিভাগে— ৩০৮ জন। এরপর তেজগাঁও ও উত্তরা বিভাগে রয়েছে ২৪০ জন করে। বিপরীতে সবচেয়ে কম মিরপুর বিভাগে।
শুধু তালিকাই নয়, মামলার সংখ্যাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত রাজধানীর ৫০ থানায় ছিনতাই ও ডাকাতির ১৬২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৯টি মামলা ওয়ারী বিভাগে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। কারণ, মোবাইল বা মানিব্যাগ ছিনতাইয়ের অনেক ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলা না করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেই থেমে যান।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। গত ৬ জুন ভোরে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে মোটরসাইকেলে থাকা ছিনতাইকারী ব্যাগ ধরে টান দিলে রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন সোহেলী ইসলাম সোমা। পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মারা যান। ১৬ জুন আদাবরের শেখেরটেকে এক বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে ৩ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে অভিযানে গেলে ছিনতাইকারীদের হামলায় আহত হন থানার ওসি ও এক পুলিশ সদস্য। ২০ জুন চলন্ত চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনে আইফোন ছিনিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়ে এক শিক্ষার্থীকে ছুরি মেরে আহত করা হয়।
এদিকে ছিনতাইকারীদের হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। গত ১১ জুন রাতে শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যান এলাকায় ছিনতাইকারীদের ধাওয়া করে আটক করতে গেলে ধারালো অস্ত্র নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায় তারা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে ছিনতাই এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি সংঘবদ্ধ নগর সন্ত্রাসে রূপ নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেছেন, মাদকের বিস্তারই ছিনতাই বাড়ার প্রধান কারণ। এর পাশাপাশি বেকারত্ব, পারিবারিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং পুলিশের দুর্বল মনোবল পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। তার মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, অপরাধের মূল উৎসে আঘাত হানতে সরকারকে সমন্বিত ও কঠোর উদ্যোগ নিতে হবে।
সরকারের প্রতি পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেছেন, সরকারকে একটি কমপ্রিহেন্সিভ প্যাকেজে যেতে হবে এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। ২০০২ সালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও সন্ত্রাস দমনে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামে বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে শান্তি ফেরানোর চেষ্টা হয়েছিল। সে সময় মানবাধিকারকর্মীরা হয়তো সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ সেটিকে স্বাগত জানিয়েছিল, কারণ তারা নিরাপত্তা চায়। সরকারকেও ভাবতে হবে যে তারা অপরাধের মূলে আঘাত করার জন্য কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেবে কি না। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় ইস্যু হলো নিরাপত্তা।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেছেন, ছিনতাইকারীসহ বিভিন্ন অপরাধীর বিরুদ্ধে নিয়মিত বিশেষ অভিযান চলছে। শুধু ১ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৫৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৬৩ জন সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী ও ডাকাত। তবে তিনি মনে করেন, শুধু পুলিশের পক্ষে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র— সব পক্ষকে একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী করছে এবং কীভাবে অর্থ উপার্জন করছে— এসব বিষয়ে পরিবারকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।




