মডেল গ্রামের অঢেল দৃষ্টান্ত

সাধারণত গ্রামের মতো মোরগের ডাকে সকাল হবে, থাকবে গরু-ছাগলের পাল চরানো রাখাল আর কৃষকদের মাঠে যাওয়ার তাড়া। কিন্তু থাকবে না দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে, বেকারত্ব; নদীভাঙনে যেন গ্রাম বিলীন না হয়, বন্যায় সব তলিয়ে না যায়, থাকবে সে ব্যবস্থাও। দেশের তিনটি গ্রাম নিয়ে এমনই পরিকল্পনা সরকারের, যে গ্রামগুলোর সব সমস্যার সমাধান করে বিশ্বের কাছে তুলে ধরা হবে উদাহরণ হিসেবে। আর এখান থেকেই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) আলো ছড়াবে পুরো দেশে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) এরই মধ্যে তিনটি গ্রাম বাছাই করেছে। সেগুলো হলো— কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার সোনারপাড়া, রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ি এবং খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার তেলিখালী।
গ্রাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে মাত্রা রাখা হয়েছে ভৌগোলিক ভিন্নতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে। দেশের প্রধান যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, সেগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে এসব গ্রাম। তিনটি ভিন্নধর্মী গ্রাম একটি সমন্বিত মডেলের আওতায় এনে পরীক্ষামূলকভাবে কার্যকর সমাধান বের করা হবে, যা পরে দেশের অন্যান্য জেলায় অভিযোজনযোগ্য মডেল হিসেবে প্রয়োগ করা যাবে। এভাবে একটি এসডিজি গ্রাম মডেল তৈরি করে তা জাতীয় পর্যায়ে স্কেল-আপ করার ভিত্তি তৈরি করবে জিইডি।
জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনার হিসাব অনুযায়ী দেশে এখন ৯০ হাজার ৪৯টি গ্রাম আছে। এর মধ্যে ব্যতিক্রম হিসেবে তৈরি করা হবে এই তিন গ্রামকে। এরই মধ্যে গ্রামগুলোর সমস্যা, চ্যালেঞ্জ ও সংকট চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি এসডিজি অভীষ্টের সঙ্গে ম্যাপিংও শেষ। ‘এখন গ্রাম তিনটিকে মডেল হিসেবে তৈরির কাজ শুরু হবে। আমি গ্রামগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করে এসেছি। প্রধানমন্ত্রীর সামনে শিগগিরই একটি প্রস্তাব আকারে উপস্থাপন করা হবে। তিনি যে নির্দেশনা দেবেন, সে অনুযায়ীই আমরা এগিয়ে যাব।’
তিন গ্রাম, ১৭ চ্যালেঞ্জ
সমাধানের জন্য এরই মধ্যে গ্রাম তিনটির প্রধান সংকট ও চ্যালেঞ্জ তুলে আনা হয়েছে। যার মধ্যে সোনারপাড়ায় রয়েছে পাঁচটি চ্যালেঞ্জ। সেগুলো হলো— ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার তীব্র নদীভাঙন, আকস্মিক বন্যা ও চরাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতা, বাল্যবিয়ের হার ৯০ শতাংশ, প্রতিবন্ধী শিশুজন্মের আধিক্য এবং মৌলিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সীমিত সুযোগ। এই গ্রামের প্রধান সংকট হচ্ছে দারিদ্র্য। পার্বত্য গ্রাম মিতিঙ্গাছড়ির ছয়টি চ্যালেঞ্জ হলো, ভৌগোলিক দুর্গমতা ও যোগাযোগ সমস্যা, অপ্রতুল মাতৃ, শিশু স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার তুলনামূলক কম হার, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ভূমিধস, অতিবৃষ্টি এবং বেকারত্বের উচ্চ হার। এ গ্রামের প্রধান সংকট হলো দুর্গম পাহাড়ি ভৌগোলিক অঞ্চল।
তেলিখালী গ্রামের ছয়টি চ্যালেঞ্জ হলো, জলবায়ুজনিত লবণাক্ত, জলাবদ্ধ ও কৃষিজমির অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, অনলাইন জুয়ার প্রবণতা, নারী-পুরুষের মজুরির তীব্র বৈষম্য, জলবায়ু অভিবাসীর আধিক্য এবং মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষর সীমিত সুযোগ। এ গ্রামের প্রধান সংকট লবণাক্ত ও জলাবদ্ধতা।
এসডিজির যেসব অভীষ্টের সঙ্গে এসব গ্রামের সংকটগুলো মিলে যায়, সেগুলো হলো— এসডিজির অভীষ্ট-১ (দারিদ্র্যবিমোচন), অভীষ্ট-৫ (লিঙ্গ সমতা), অভীষ্ট ১০ (আয়বৈষম্য হ্রাস), অভীষ্ট-৩ (সুস্বাস্থ্য), অভীষ্ট-৪ (মানসম্মত শিক্ষা), অভীষ্ট-৮ (শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি), অভীষ্ট-৯ (উদ্ভাবন ও অবকাঠামো এবং অভীষ্ট-১৩ (জলবায়ু পদক্ষেপ)।
সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গেও গ্রামগুলোর সমস্যা ও সংকট কীভাবে সম্পর্কযুক্ত, তা দেখিয়েছে জিইডি। যেমন— নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া আছে তিস্তা মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন, নদীশাসন ও পুনর্বাসন স্কিম, বাল্যবিয়ে রোধে কঠোর আইনি ও সামাজিক সুরক্ষাবলয় তৈরি। এগুলোর সবই কুড়িগ্রামের সোনারপাড়ার জন্য প্রযোজ্য।
আবার মিতিঙ্গাছড়ির সমস্যা সমাধানে নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, পার্বত্য এলাকায় বিশেষ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ প্রকল্প নেওয়া হবে। ইশতেহারের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা বাঁধ, লবণাক্ত সহিষ্ণু কৃষি গবেষণা এবং নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের মাধ্যমে শ্রমবৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে সমাধান হবে খুলনার তেলিখালী গ্রামের সমস্যা।




