হামে নিভছে শৈশব
মুক্তি দুই সপ্তাহে, নাকি দুই মাস

সংগৃহীত ছবি
হাসপাতালের বারান্দায় মা-বাবার বুকফাটা আর্তনাদ আর অসুস্থ শিশুর নিস্তেজ চোখ— দেশের নানা প্রান্তে নিত্যই দেখা যাচ্ছে এমন দৃশ্য। দেশে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে সংক্রামক ব্যাধি হাম। এরই মধ্যে কেড়ে নিয়েছে ৪৩২টি নিষ্পাপ প্রাণ। এ সংকট থেকে মুক্তি পেতে সরকার দুই সপ্তাহের আশার কথা শোনালেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুক্তির পথ আরও অন্তত দুই মাসের দীর্ঘ। সরকার বলছে, দুই সপ্তাহেই কাটবে এই আঁধার, কিন্তু জনস্বাস্থ্যবিদরা শঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, দেশ পুরোপুরি হামমুক্ত হতে আরও অন্তত দুই মাস সময় লাগবে।
দেশে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ৮টি নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে গেছে হামে। নতুন করে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ৪৮৯ শিশু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে হাসপাতালের শয্যায় বা মেঝেতে। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫৩ হাজার। যাদের অনেকেরই আশ্রয় মেলেনি হাসপাতালের বিছানায়। অ্যাম্বুলেন্সে কিংবা হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরে আইসিইউ না পেয়ে নিভে যাচ্ছে আগামীর সম্ভাবনা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতে, শিশুদের চরম অপুষ্টিই উচ্চ মৃত্যুহারের মূল কারণ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে হাসপাতালে শয্যা ও দক্ষ জনবলের প্রকট সংকট। ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোয় উন্নত চিকিৎসা না থাকায় অসহায় বাবা-মায়েরা ভিড় করছেন রাজধানী ঢাকায়। কিন্তু এখানেও আইসোলেশন ওয়ার্ডে ঠাঁই মিলছে না অনেকের। অনেক অভিভাবকই সন্তানকে নিয়ে ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। কারও বা ভাগ্যে জুটছে কয়েক ঘণ্টার অ্যাম্বুলেন্স জীবন, আবার কেউবা আইসিইউর অপেক্ষায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে।
হামে আক্রান্ত আট মাসের মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে এসেছেন গাজীপুরের পারুল বেগম। শিশুটিকে স্থানীয় হাসপাতালে কয়েক দিন চিকিৎসার পর এখানে ভর্তি করা হয়েছে। শিশুটি এখন হাম-পরবর্তী জটিলতা নিউমোনিয়ায় ভুগছে।
ফ্যালফ্যাল চোখে পারুল বেগম আগামীর সময়কে বললেন, ‘ম্যালা চেষ্টা-তদবির কইর্যা হাসপাতালে সিট পাইছি। কয়েক ঘণ্টা মাইয়্যারে অ্যাম্বুলেন্সেও রাখতে হইছে। কিছু ট্যাকা-পয়সাও খরচ করা লাগছে।’ এর আগে তার এলাকায় হামের রোগী দেখা না গেলেও সম্প্রতি পরিচিত কয়েক শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানালেন পারুল।
দেশে বিস্তৃত পরিসরে হামের প্রকোপ শুরুর পর গত ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নতুন করে হাম-সংক্রান্ত তথ্য রাখছে। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্য বলছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৪৮৯ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে, যা গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১৬ শতাংশ বেশি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মার্চে প্রথম হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়। হাম ঠেকাতে টিকা আমদানিসহ গ্রহণ করা হয় নানা পদক্ষেপ। যদিওবা বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের হিসাবের খাতায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেই হামের রোগী হাসপাতালে আসার খবর মেলে। দিনে দিনে হামে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে। মৃত্যুও থামছে না।
জনস্বাস্থ্য বিষয়ে গত ৪০ বছর ধরে কাজ করছেন মোহাম্মদ ইকবাল। তিনি বলছেন, অনেক ব্যর্থতার ফলস্বরূপ শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে, নানা ধরনের জটিলতা নিয়ে হামে মারা যাচ্ছে। সরকার দ্রুততার সঙ্গে কাজ করলেও দেশ হামমুক্ত হতে সময় লাগবে আরও দুই মাস।
অবশ্য গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার দাবি করেন, দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে হাম পরিস্থিতি। তিনি বলেছেন, সরকার প্রথমে গত ৫ এপ্রিল থেকে উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ স্থানে টিকার ক্যাম্পেইন শুরু করে, যা চলমান আছে, যার ফল পেতে আরও দুই-তিন সপ্তাহ লেগে যাবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৮ শিশুর। এর মধ্যে একজনের নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত ৪৩২ শিশুর হামে মৃত্যু হলো। বিভাগ হিসেবে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সিলেটে মৃত্যু হয়েছে তিন শিশুর। এর মধ্যে দুই শিশু মারা গেছে সুনামগঞ্জ জেলায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্তাদের ভাষ্য, বিশ্ব জুড়েই হাম বাড়ছে, তবে বাংলাদেশে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হওয়ার পেছনে মূল দায় শিশুদের অপুষ্টি। এ ছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলে সঠিক সময়ে উন্নত চিকিৎসা না পৌঁছানোকেও দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় এনেছে। ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম এবং আরসিএম অ্যাপের মাধ্যমে খোঁজা হচ্ছে টিকাবঞ্চিত শিশুদের। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোয় বাড়াতে হবে আইসোলেশন ও আইসিইউ সুবিধা। শুধু টিকা নয়, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করাও জরুরি। দক্ষ জনবল দিয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে গড়ে তুলতে হবে বিশেষায়িত ওয়ার্ড।
সরকারের আশ্বাস বনাম বিশেষজ্ঞদের এই সতর্কবার্তার মধ্যে প্রতিটি মুহূর্ত এখন হয়ে উঠেছে উৎকণ্ঠার। কত দ্রুত এই সংকট থেকে মুক্তি মিলবে, সেই আশায় বুক বেঁধে আছেন দিশাহারা অভিভাবকরা।
স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকেই হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ বাড়তে থাকে। ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলো হামের রোগীকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দিলেও আইসিইউসহ উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকাতে পাঠিয়ে দেয়। আইসোলেশন ওয়ার্ডে শয্যা পর্যাপ্ত না থাকায় রোগীরা ঢাকার হাসপাতালগুলোয় ভর্তি হতে মুখোমুখি হচ্ছে নানা সমস্যার। কখনো কয়েক হাসপাতালে ঘুরে ভর্তি হয়। আবার দরকার হলেও পায় না আইসিইউ সেবা।
যশোরের আল-রায়হান রাফী হামে আক্রান্ত হয় ৩ মাস ১৬ দিন বয়সে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। চার হাসপাতাল ঘুরে আর ১৫ হাজার টাকা অ্যাম্বুলেন্স বিল দিয়ে অবশেষে ঢাকা শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়। তিন দিন আইসিইউতে থেকে গত ১৬ এপ্রিল মারা যায় রাফী।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ইকবাল বলছেন, হামের চিকিৎসার জন্য শিশুদের যাতে বিভাগীয় শহরে না যেতে হয়, সে বিষয়ে দিতে হবে গুরুত্ব। হামের জন্য দরকার অনুযায়ী স্পেশাল ওয়ার্ড করতে হবে। সে অনুযায়ী এসব ওয়ার্ডে নিয়োগ দিতে হবে দক্ষ জনবল। হাম পরিস্থিতি এবং জাতীয় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের বিষয়ে জানাতে গতকাল সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এতে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেছেন, বিশ্বব্যাপীই হামের সংক্রমণ বাড়ছে। তবে বাংলাদেশে আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুহার বেশি। এর প্রধান কারণ অপুষ্টি। হামের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তিনি আরও বলেছেন, দেশের স্বাস্থ্য খাত অবহেলিত। এতে নানা রকম সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে হামে শিশুমৃত্যুকে বুঝতে হলে শিশুর পুষ্টি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ জরুরি। এ বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সরকার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি হাসপাতালে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে এরই মধ্যে অনেক হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়েছে ভেন্টিলেটর, আইসোলেশন ওয়ার্ড চালুসহ বাড়ানো হয়েছে শয্যার সংখ্যা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, হাম ঠেকাতে সরকার এরই মধ্যে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় এনেছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি। তবে এখনো অনেক শিশু টিকার আওতায় আসেনি। সরকার আরসিএম অ্যাপের মাধ্যমে শিশুদের শনাক্ত করে তাদের টিকার আওতায় আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বললেন, দেশের সব সরকারি হাসপাতালের শিশু বিভাগের চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয় করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে হাম আক্রান্তদের। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের টিকার আওতায় আনতে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, চট্টগ্রামে পরিচালনা করা হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ টিম। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমের সহায়তা চান তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, ইউনিসেফের প্রতিনিধি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিসহ গণমাধ্যমকর্মীরা।




