ছায়ানটে সেই ভোরের সাক্ষীরা, আলতাফ মাহমুদ কেন ফিরলেন না?

সংগৃহীত ছবি
১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট ভোরে ঢাকার বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল সুরকার আলতাফ মাহমুদকে। এরপর তার কী পরিণতি হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট কোনো নথি নেই, নেই কোনো কবরও। আছে শুধু কয়েকজন মানুষের স্মৃতি, যারা মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছিলেন। তাদের স্মৃতিতেই উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে আলতাফ মাহমুদের ভূমিকা এবং তার হারিয়ে যাওয়ার অমীমাংসিত অধ্যায়।
শনিবার বিকেলে রাজধানীর ছায়ানট মিলনায়তনে সেই স্মৃতির কিছুটা মঞ্চে উঠে আসে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদের মুক্তিযুদ্ধ এবং তার সহযোদ্ধাদের বিস্ময়করভাবে বেঁচে ফেরার গল্প নিয়ে ‘স্মৃতি ৭১’ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে আলতাফ মাহমুদের হারিয়ে যাওয়া গান উদ্ধারে গবেষণা অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেয় স্মৃতি ৭১। স্বাগত বক্তব্যে ফারুক এইচ খান বলেন, ‘আলতাফ মাহমুদ অনেক গান রেখে গেছেন। তার বড় একটা অংশ আজ হারিয়ে গেছে। কোনোটা রেকর্ডে নেই, কোনোটা কারও স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে আসছে। তার সেই গানগুলো আমরা খুঁজে আনব।’ এ কাজে গবেষক, সংগীতপ্রেমী ও তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
একাত্তরের আগস্টের শেষে ঢাকার গেরিলারা একের পর এক আঘাত হেনে পাকিস্তানি বাহিনীর ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। ২৯ আগস্ট ধরা পড়েন বদি, রুমী, জুয়েল ও আজাদ। তাদের একজনের সূত্র ধরেই সেনারা পৌঁছে যায় আলতাফ মাহমুদের বাসায়। সেদিন ভোরে তার বাসায় অস্ত্র ও গোলাবারুদভর্তি একটি ট্রাঙ্ক পাওয়া যায়। গায়ক ও সুরকার হিসেবে পরিচিত আলতাফ মাহমুদ নিজের ঘরেই মুক্তিযুদ্ধের অস্ত্র আগলে রেখেছিলেন। এরপর তাকে আর কেউ দেখেনি। ধারণা করা হয়, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নাখালপাড়ার সেনা ক্যাম্পে নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া অন্যদের পরিণতিও একইভাবে ঘটে।
ছায়ানটের মঞ্চে সেদিনের কথা বলতে এসেছিলেন আলতাফ মাহমুদের সহযোদ্ধা চিত্রশিল্পী আবুল বারক আলভী, ব্যাংকার নাসের বখতিয়ার এবং সংগীতশিল্পী লীনু বিল্লাহ ও খনু বিল্লাহ। একাত্তরের সেই সময়ে তাদের কাছে ধরা পড়া মানেই ছিল ফিরে আসার অনিশ্চয়তা।
আবুল বারক আলভী বলেন, ‘আলতাফ ভাইয়ের সুর আমরা সবাই গাই। কিন্তু মানুষটা যে একটা ভোরে ঘর থেকে উঠে গিয়ে আর ফিরলেন না, সেটা আমরা ভুলে যাই। আমি বেঁচে ফিরেছি, আজও আমার কাছে এটা বিস্ময়। যারা ফেরেননি, তাদের কথা বলার দায় আমাদের ঘাড়েই রয়ে গেছে।’
নাসের বখতিয়ারের কথায় উঠে আসে সেই সময়ের এক অমীমাংসিত প্রশ্ন। তিনি বলেন, ‘সারাজীবন ব্যাংকে হিসাব মিলিয়েছি। একাত্তরের একটা হিসাব আজও মেলাতে পারিনি। আমরা কেন ফিরলাম, আর আলতাফ কেন ফিরল না? সে গান বেঁধেছে, ঝুঁকিও নিয়েছে। গান দিয়ে সাহস দিয়েছে, নিজের ঘরে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য জায়গাও রেখেছে।’
লীনু বিল্লাহ বলেন, ‘একাত্তরের কথা বলতে গেলে আজও গলা আটকে আসে। কিছু স্মৃতি সুরে ধরা যায় না, বুকে বয়ে বেড়াতে হয়।’
খনু বিল্লাহ বলেন, ‘আমরা বেঁচে ফিরেছি বলেই গল্পটা বলতে পারছি। এটাকে আমি সৌভাগ্য বলি না, এটা ঋণ। আজকের তরুণরা যদি শুধু গানটা চেনে, মানুষটাকে না চেনে, তাহলে ইতিহাসের অর্ধেকটাই আমরা হারাব।’
ছায়ানটের সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী বলেন, ‘সংস্কৃতি আর মুক্তিযুদ্ধ আলাদা কিছু নয়। আলতাফ মাহমুদ সেই কথারই জীবন্ত প্রমাণ।’
সাংস্কৃতিক সংগঠক ফজলুল কবীর তুহিন বলেন, ‘একজন সুরকার, যিনি সুরকে অস্ত্র বানিয়েছিলেন, তার গল্প একটা সন্ধ্যায় শেষ হওয়ার নয়। আজকের আয়োজন সেই গল্পের শুরু মাত্র।’
স্মৃতি ৭১-এর মাহবুব জামান বলেন, ‘একাত্তরের স্মৃতি মুছে গেলে জাতির শিকড় আলগা হয়ে যায়। সাক্ষীদের কথা রেকর্ড হোক, মঞ্চে আসুক, নতুন প্রজন্ম শুনুক।’
অনুষ্ঠানে তথ্যচিত্র ‘হৃদয়ে একাত্তর’ প্রদর্শন করা হয়। বেঁচে ফেরার ঘটনাগুলো ঘিরে মঞ্চস্থ হয় একটি নাটক। স্মৃতিচারণ শেষে চার বক্তাকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন নদী গোমেজ, প্রিয়াংকা ও নৈরিতা রেজওয়ান। সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় অনুষ্ঠান। আলতাফ মাহমুদের সুর করা গান পরিবেশন করেন লীনু বিল্লাহ, ফাউজিয়া আলফা ও শারমীন।




