৯১তম জন্মদিনে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
‘মানবতা নয়, আজ মনুষ্যত্বই বিপন্ন’
- বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে সামাজিক মালিকানার আহ্বান

বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ৯১তম জন্মদিনের আলোচনাসভা করা হয়। ছবি: আগামীর সময়
৯ দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজভাবনার জগতে সক্রিয় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার ৯১তম জন্মদিনে ফিরে দেখলেন নিজের সময়, সমাজ ও মানবসভ্যতার দীর্ঘ যাত্রাপথকে। সেই আত্মসমীক্ষার মধ্য দিয়ে উঠে এলো বৈষম্য, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
আজ মঙ্গলবার বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে তার ৯১তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘কি দেখেছি, কি বুঝেছি’ শীর্ষক আত্মজৈবনিক বক্তৃতা দেন তিনি। দীর্ঘ জীবন-অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার বিশ্লেষণ তুলে ধরেন এই প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তক।
বর্তমান সমাজে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, আত্মহত্যা, একাকিত্ব, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিস্তারকে তিনি পুঁজিবাদী উন্নয়নের ফল বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও মানুষের মানবিক অবস্থার উন্নতি ঘটেনি বরং সামাজিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।
বিশ্ব পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেছেন, ‘পুঁজিবাদ আজ বৈশ্বিক সংকট তৈরি করেছে এবং সম্পদ ক্রমেই অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। তার ভাষায়, মানবতা নয়, আজ মনুষ্যত্বই বিপন্ন।’
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘ব্যক্তি মালিকানাভিত্তিক ব্যবস্থার ভূমিকা শেষ হয়ে এসেছে। মানুষের মুক্তি, প্রকৃত গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সামাজিক মালিকানাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
তার মতে, ব্যক্তি মালিকানার জায়গায় সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠাই আজকের সময়ের প্রধান কর্তব্য।
বক্তৃতায় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘বর্তমান বিশ্বে সম্পদ ও ক্ষমতার বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে। একসময় যেখানে ‘১০ বনাম ৯০’-এর বৈষম্যের কথা বলা হতো, এখন তা ‘১ বনাম ৯৯’-এ এসে পৌঁছেছে। অর্থাৎ অতি অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, আর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বঞ্চনার শিকার হচ্ছে।’
‘বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতি সত্ত্বেও সেই উন্নয়নের সুফল সমভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। উৎপাদন ও সম্পদের মালিকানা এখনো সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত। তার মতে, এই সংকটের মূল কারণ ব্যক্তি মালিকানাভিত্তিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা।’
বিশ্বব্যবস্থার সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘একসময় বিভিন্ন দেশে সামাজিক মালিকানাভিত্তিক সমাজ গঠনের উদ্যোগ দেখা গেলেও পুঁজিবাদ নানা কৌশল, প্রলোভন ও চাপের মাধ্যমে আবার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। এর ফলে বিশ্ব আজ বৈষম্য, পরিবেশ সংকট এবং মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের মুখোমুখি।’
তিনি স্মরণ করেন ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক ঘটনাবলি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী বাস্তবতা। তার ভাষায়, নির্বাচনের ইতিহাস বারবার সম্ভাব্য বিপ্লবী পরিস্থিতিকে থামিয়ে দিয়েছে এবং ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত বুর্জোয়া রাজনৈতিক শক্তির হাতেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছেন, ‘জাফরুল্লাহ সামাজিক মালিকানায় বিশ্বাস করতেন। তিনি যে প্রতিষ্ঠানগুলো গড়েছেন, সেগুলোও সামাজিক মালিকানার ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।’ একই সঙ্গে তিনি অধ্যাপক আহমদ শরীফের সমাজতান্ত্রিক চিন্তার কথাও স্মরণ করেন।
সামাজিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘মানুষের মুক্তি, বৈষম্যহীন সমাজ এবং উৎপাদনশক্তির পূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করতে সামাজিক মালিকানাভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’ তার মতে, সামাজিক বিপ্লবের মধ্য দিয়েই মানবসমাজ একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে মওলানা ভাষানী পরিষদের সভাপতি এ এস এম কামাল উদ্দীন বলেছেন, ‘দেশের দীর্ঘ সামাজিক-রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চিন্তক, বুদ্ধিজীবী ও সমাজ পরিবর্তনের কারিগররা নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।
তিনি বলেছেন, ‘অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সেই ধারার একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব, যিনি সমাজের দ্বন্দ্ব-বিরোধ দূর করে মানুষের জন্য সুখী ও সমৃদ্ধ জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।’
সাংস্কৃতিক পর্বে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের ঢাকা মহানগর শাখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সার্থক জনম আমার’ ও ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ গান পরিবেশন করে। অনুষ্ঠানে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জীবনবৃত্তান্ত পাঠ করেন অধ্যাপক আজফার হোসেন।
অধ্যাপক হারুন রশীদের সঞ্চালনায় বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। শুভেচ্ছা জানানো সংগঠনগুলোর মধ্যে ছিল দৈনিক আমাদের সময়, বাসস (মার্ক্সবাদী), জাতীয় কবিতা পরিষদ, বিশ্ব সাংস্কৃতিক অঙ্গন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, আহমদ রফিক ফাউন্ডেশন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ঐতিহ্য, বেঙ্গল বুকস, দেশ রূপান্তর, ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল ট্রাস্ট, বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলন, দৈনিক সংবাদ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী (একাংশ), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, মওলানা ভাষানী পরিষদ, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, গ্রিন ভয়েস, জাতীয় গণফ্রন্ট, সমাজচিন্তা ফোরাম, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, প্রাচ্যনাট, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, দৈনিক দেশের কণ্ঠ, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, লিটল ম্যাগ ‘শালুক’, কথা প্রকাশ, সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী সংঘ, বিক্রমপুর কথকতা এবং সাংবাদিক আবু সাইদ খান।





