মীমাংসার পর ‘ক্ষমা’ চাইলেও প্রাণ দিতে হয় পারভেজকে
- দুই তরুণীসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল
- বৈষম্যবিরোধী নেতা সোবহানসহ ৮ জনের অব্যাহতির সুপারিশ
- ফোনে বন্ধুদের ডাকেন পিয়াস, মেহেরাজ, মাহাথির ও কামাল
- দৌড় দিয়েও প্রাণ রক্ষা করতে পারেননি পারভেজ

প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়
রাজধানীর বনানীতে প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা জাহিদুল ইসলাম পারভেজ হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকা দুই তরুণীসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। তবে বনানী থানার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক সোবহান নিয়াজ তুষারসহ আটজনকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বনানী থানার পুলিশ পরিদর্শক এ কে এম মঈন উদ্দিন এই অভিযোগপত্র দেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, ইউনিভার্সিটির প্রক্টর অফিসে মীমাংসার পর ‘ক্ষমা’ চেয়ে ছিলেন পারভেজ। তবে দুই তরুণীর প্ররোচনা ও ইন্ধনে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তিনি।
তদন্তকারী কর্মকর্তা এ কে এম মঈন উদ্দিন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এই মামলায় ৯ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি৷ এছাড়া আট আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। এদের মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি। অপর চারজন জড়িত থাকলেও পূর্নাঙ্গ নাম ঠিকানা পাওয়া যায়নি।’
মামলার বাদী হুমায়ুন কবিরের ভাষ্য, ‘আমরা এই হত্যা মামলায় আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা প্রত্যাশা করছি। দ্রুত সময়ে যাতে বিচার শেষ হয়, এজন্য ঈদের পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করব।’
অভিযোগপত্রে উল্লেখিত আসামিরা হলেন— মেহেরাজ ইসলাম, আবু জহর গিফফারি ওরফে পিয়াস, মো. মাহাথির হাসান, মো. আল কামাল শেখ ওরফে কামাল, আলভী হোসেন জুনায়েদ, আল আমিন সানি, ফাতেমা তাহসিন ঐশী, ফারিয়া হক টিনা ও রাকিব।
আসামিদের মধ্যে পিয়াস, ঐশি ও রাকিব পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সুপারিশ করা হয়েছে। সোবহান নিয়াজ ছাড়া অব্যাহতির সুপারিশ করা অন্যরা হলেন মারুফ মিয়াজি হৃদয়, রিফাত, আলী, ফাহিম, সাকিব, নাসিম ও নিবির।
ফোনে বন্ধুদের ডাকেন পিয়াস, মেহেরাজ, মাহাথির ও কামাল
ভুক্তভোগী জাহিদুল ইসলাম পারভেজ ছিলেন পিতা-মাতার একমাত্র পুত্রসন্তান। তিনি প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটির টেক্সটাইল বিভাগের ৩য় বর্ষে পড়তেন। ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল তিনি ইউনিভার্সিটিতে মিডটার্ম পরীক্ষা দিতে যান। পরীক্ষা শেষে বিকেল ৩টার দিকে পারভেজ তার বন্ধু তরিকুল ও ইমতিয়াজসহ আরও অনেকে ইউনিভার্সিটির বিপরীত দিকে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন এবং হাসাহাসি করছিলেন।
ওই সময় তাদের পেছনে একই ইউনিভার্সিটির ছাত্র আবু জহর গিফফারি পিয়াস, তার বান্ধবী ফাতেমা তাহসিন ঐশী এবং ফারিয়া হক টিনা দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। পিয়াসের দুই বান্ধবী ভেবেছিল পারভেজরা তাদের নিয়ে হাসাহাসি করছেন। তখন পিয়াস হাসাহাসির কারণ সম্পর্কে পারভেজের কাছে জানতে চান। এটা নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। আসামি পিয়াস ফোনে আসামি মেহেরাজকে কল করে দ্রুত ঘটনাস্থলে আসতে বলেন।
পরে মেহেরাজ তার সঙ্গে থাকা মাহাথিরকে নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন এবং পিয়াসের পক্ষ নিয়ে তর্কাতর্কি শুরু করেন। কামাল, জুনায়েদ ও সানিকে ফোন করে লোকজন নিয়ে ইউনিভার্সিটির সামনে আসতে বলেন আসামি মাহাথির। মেহেরাজও তার বন্ধু নাসিমকে দ্রুত লোকজন নিয়ে ঘটনাস্থলে আসতে বলেন। আসামি ফাহিমকে ফোন করে তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে আসতে বলেন কামাল। আসামি ফাহিম তার বন্ধু সাকিবকে নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। আসামি মাহাথিরের ফোন পেয়ে আসামি জুনায়েদ, সানি ও রাকিব ঘটনাস্থলে চলে আসেন। আসামি মেহেরাজের ফোন পেয়ে সেখানে আসেন আসামি নাসিমও। তারা সকলেই একত্রিত হয়ে পিয়াসদের পক্ষ নিয়ে হট্টগোল সৃষ্টি করেন এবং পারভেজকে মারধর করতে উদ্যত হন।
যদি ভুল মনে করে থাকো, আমাকে ক্ষমা করে দিও: পারভেজ
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষিকা গণ্ডগোল দেখতে পেয়ে দ্রুত নিচে আসেন। পিয়াস, মেহেরাজ, মাহাথির, ঐশী, টিনা এবং পারভেজ ও তরিকুলকে প্রক্টর রুমে নিয়ে যান। সহকারী প্রক্টর হাসেমসহ আরও অনেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তারা সকলের পরিচয় ও বক্তব্য শুনেন। তর্কাতর্কি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে শিক্ষিকা সুষমা সাহা স্বাতীসহ অন্যরা উভয়পক্ষকে শান্ত করেন এবং মীমাংসা করে দেন। দুই পক্ষ একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন। এ সময় ঐশী ও টিনাকে নিজের বোন বলে সম্বোধন করে পারভেজ বলেন, ‘যদিও আমি কিছু করিনি, তবুও যদি ভুল মনে করে থাকো, আমাকে ক্ষমা করে দিও।’
ঘটনা সেখানেই শেষ হয়ে যায়।
দৌড়েও প্রাণ রক্ষা করতে পারেননি পারভেজ
মীমাংসার পর ঘটনার দিন বিকেল ৪ টা ৪০ মিনিটের দিকে ইউনিভার্সিটির বাইরে পারভেজের বন্ধু তরিকুল ইসলামকে দেখতে পেয়ে আসামি নাসিম কাঠের বাটাম দিয়ে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারপিট করে রক্তাক্ত জখম করেন। আসামি মেহেরাজ, ফাহিমসহ অন্যরাও তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে কিল-ঘুষি মারেন। একপর্যায়ে তারা ভুক্তভোগী পারভেজকে দেখতে পেয়ে তার ওপর চড়াও হন। প্রথমে আসামি মেহেরাজ তাকে কিল-ঘুষি ও চড়-থাপ্পড় মারেন। আসামি নাসিম কাঠের বাটাম দিয়ে তাকে মারধর করেন।
পারভেজ নিজের প্রাণ রক্ষায় দৌড় দিয়ে ইউনিভার্সিটির মূল গেটের সামনে আসলে আসামি সাকিব ফুলের টব দিয়ে তাকে আঘাত করেন। তাদের মারধরে পারভেজ পড়ে যান। তিনি আবার উঠে দাঁড়ানো মাত্রই আসামি রাকিব চাকু দিয়ে পারভেজের বুকের বাম পাশে আঘাত করে রক্তাক্ত জখম করেন। এই অবস্থায় পারভেজ ইউনিভার্সিটির গেটের ভেতর ঢুকে পড়ে। তার বুক থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। শিক্ষিকা সুষমা সাহা স্বাতী ওড়না দিয়ে এবং ছাত্রদের শার্ট দিয়ে বেঁধে পারভেজকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এর আগে গত বছরের ১৯ এপ্রিল জাহিদুল ইসলাম পারভেজ নিহত হন। এ ঘটনার পরের দিন ২০ এপ্রিল পারভেজের ফুফাতো ভাই হুমায়ুন কবির বাদী হয়ে বনানী থানায় হত্যা মামলা করেন।







