‘আগে কিনত দু-তিন কেজি, এখন আধা কেজি’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আকাশের মেঘ ছেয়েছে নিত্যপণ্যের বাজার। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দাম বেড়েছে অধিকাংশ পণ্যের। বিশেষ করে শাক-সবজির মূল্য চড়া। অধিকাংশ কাঁচাপণ্য বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি মূল্যে। এতে সদাইয়ের পরিমাণে কাটছাঁট করছেন ক্রেতা, আর গ্রাহকের জন্য অপেক্ষা বাড়ছে বিক্রেতার। স্বস্তিতে নেই কেউই।
এই চিত্র দেখা গেল রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি দোকানগুলোয়। আর খুচরা বাজারের দৃশ্য আরও করুণ। সবজি, মাছ, মুরগি— প্রায় সব নিত্যপণ্যের দামই চড়া। একটু ছাড় পাওয়ার আশায় এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরছেন ক্রেতা। অবশেষে চাহিদার তুলনায় কম সদাই নিয়েই ফিরতে হচ্ছে তাদের।
অন্যদিকে স্বস্তিতে নেই বিক্রেতারাও। তারা বলছেন, গত কয়েকদিনের বৃষ্টি ও তেলের দামের সঙ্গে বেড়েছে পরিবহন খরচ। কমেছে বিক্রি।
গতকাল রবিবার সকালে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্যের দাম জিজ্ঞেস করতেই বেরিয়ে এলো হতাশার সুর। তারা জানালেন, মানভেদে লম্বা বেগুন কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়, আর বড় গোল বেগুনের দাম উঠছে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। কাঁকরোলও বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজিতে। এ ছাড়া টমেটো ৬০-৭০ টাকা, বরবটি ও ঝিঙে ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং পটোল ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। কাঁচামরিচের কেজি ১২০ টাকা। করলা ও লাউয়ের দামও যাচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে।
কিছুটা স্বস্তি আছে আলু ও পেঁয়াজের বাজারে। প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়।
সন্তানরা মাছ খেতে চায়, কিন্তু এখন বাজারে গেলে লাগে ভয়। এক কেজি পাঙাশও ২০০ থেকে ২২০ টাকা। অন্য মাছের কথা না হয় বাদই দিলাম
দাম শুনে খরচে কাটছাঁট করার কথা জানালেন ক্রেতা আবদুল মালেক। বাজারে এসে এখন হিসাব করে চলতে হয়। চড়া মূল্যের কারণে প্রয়োজন হলেও কেনা যাচ্ছে না। তাই চাহিদার তুলনায় কম পণ্য নিয়েই ফিরতে হচ্ছে বাড়ি— আক্ষেপ করলেন তিনি।
কারওয়ান বাজারে ছোট্ট দোকান সাজিয়ে বসেছেন সবজি বিক্রেতা মো. সোহেল। ভোরে আড়ত থেকে নেন পণ্য। সকাল থেকে শুরু হয় বিক্রি। তবে আগের মতো ব্যবসা নেই বলে মন খারাপ এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর।
সোহেলের ধারণা, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে অনেক জায়গায় নষ্ট হয়েছে ফসল। আবার জ্বালানির উচ্চমূল্য ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আসতে পারছে না ঢাকায়। সরবরাহ কম হওয়ায় চড়ছে দাম।
‘আমরা বেশি দামে কিনছি, তাই বিক্রিও করতে হচ্ছে চড়া মূল্যে। এ কারণে আগের মতো কিনতে পারছেন না ক্রেতারাও’— ব্যাখ্যা করলেন তিনি।
বাড়িতে তিন সন্তান। আগে একবার বাজার করলে দু-তিন দিন যেত। এখন এক দিনের বাজার করাটাই কষ্টকর। দাম বেশি হওয়ায় পরিমাণে কাটছাঁট করেই চলতে হচ্ছে
বিক্রি কমে যাওয়ার তথ্য দিলেন অন্য বিক্রেতা আনিস। বললেন, আগে একজন ক্রেতা একসঙ্গে নিতেন দু-তিন কেজি সবজি। এখন আধা কেজি বা এক কেজির বেশি নিতে চান না অনেকেই। অধিকাংশই চলে যান দাম শুনে। এতে কমছে বিক্রি ও মুনাফা— উভয়ই।
বৃষ্টির কারণে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা দাম বাড়ার কথা জানালেন বিক্রেতারা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে শসার। কেজিতে ৩০ টাকা থেকে বেড়ে গতকাল হাইব্রিড শসা বিক্রি হয়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। এ ছাড়া বেগুন, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, টমেটোর দামও কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। পেঁপে ও কাঁচা মরিচের মূল্যও ২০ টাকা বেড়ে যথাক্রমে বিক্রি হচ্ছে ৪০ এবং ৮০ থেকে ১০০ টাকায়।
একের পর এক দোকানে বেগুনের দাম জিজ্ঞেস করতে দেখা গেল হার্ডওয়্যার দোকানের তরুণ শ্রমিক তুষারকে। তাকে একই সুরে জবাব দিয়ে হতাশ করছেন দোকানিরা, জানাচ্ছেন— বেগুনের কেজি ১০০ টাকা, কোনো কম হবে না। তবে ৮০ টাকায় কেনার আশায় দোকানের পর দোকান মাড়িয়ে চললেন তুষার। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে এক কেজির পরিবর্তে কিনলেন ৫০০ গ্রাম।
বাড়িতে তিন সন্তান। আগে একবার বাজার করলে দু-তিন দিন যেত। এখন এক দিনের বাজার করাটাই কষ্টকর। দাম বেশি হওয়ায় পরিমাণে কাটছাঁট করেই চলতে হচ্ছে— মলিন মুখে জানালেন তুষার।
একই বাজারে দেখা হয় আফরোজা বেগমের সঙ্গে। মাছ কেনার জন্য দরদাম করছিলেন তিনি। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘সন্তানরা মাছ খেতে চায়, কিন্তু এখন বাজারে গেলে লাগে ভয়। এক কেজি পাঙাশও ২০০ থেকে ২২০ টাকা। অন্য মাছের কথা না হয় বাদই দিলাম।’
আগে মাসে অন্তত দু-তিনবার কিনতে পারতেন মুরগি। এখন সেটি কমাতে বাধ্য হয়েছেন— যোগ করলেন তিনি।
মাছ মাংস ডিমের বাজারেও আগুন
মাছের বাজারেও দামের ঊর্ধ্বগতি। চাষের পাঙাশ ২২০-২৩০ টাকা, তেলাপিয়া ২৫০-২৬০ এবং রুই ৪০০-৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মাছের দাম আরও বেশি; মিলছে না ৭০০ টাকার নিচে। ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশও বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজিতে।
অন্যদিকে, ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮৫-১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি কাটছে ৩৩০-৩৫০ টাকায়। একই সঙ্গে ডিমের বাজারেও মিশ্র চিত্র। এক ডজন লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়।
সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্বস্তির সম্ভাবনা কম— আশঙ্কা বিক্রেতাদের।




