আনু মুহাম্মদ
বাণিজ্য চুক্তিতে সই করেছে ‘মার্কিন পক্ষের লোক’

ছবি: আগামীর সময়
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি আদৌ ‘চুক্তির মধ্যে’ পড়ে কি না প্রশ্ন তুলেছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা অসম বাণিজ্য চুক্তি বাতিল, ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা, ফিলিস্তিনে গণহত্যা এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও যুদ্ধ বন্ধ করার দাবিতে গোলটেবিল আলোচনা করে ১৩-দলীয় জোট। সেখানে বক্তব্য রাখছিলেন আনু মুহাম্মদ।
তিনি বলেছেন, ‘বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি হওয়া একটি স্বাভাবিক বিষয়, তবে এটি আদৌ সাধারণ বাণিজ্য চুক্তির মধ্যে পড়ে কি না তা ভাববার বিষয়। স্বাভাবিক বাজার ভারসাম্যের নিয়ম হলো, দেশের প্রয়োজন সে আমদানি করবে এবং অতিরিক্ত পণ্য থাকলে রপ্তানি করবে, আর যে দেশ থেকে কম মূল্যে পাওয়া যাবে সেখান থেকেই পণ্য আনা হবে। কিন্তু এই চুক্তিটি পড়লে মনে হয় এখানে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ প্রবাদের চেয়েও বেশি বাধ্যবাধকতা।’
‘যেখানে অন্য দেশগুলো এই চুক্তি নিয়ে ভাবছে, সময় নিচ্ছে কিংবা নাকচ করে দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ নিজ দায়িত্বে এই চুক্তি সম্পন্ন করেছে। যারা এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে তারা মূলত মার্কিন পক্ষেরই লোক’, যোগ করেন এই অর্থনীতিবিদ।
নির্বাচিত সরকার এসেও চুক্তি অব্যাহত রেখেছে উল্লেখ করে আনু মুহাম্মদ আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বেশি দামে পণ্য আমদানি করলে তা দেশীয় বাজারে বিক্রি হবে না, ফলে সরকারকে সেখানে ভর্তুকি দিতে হবে এবং রাষ্ট্র রাজস্ব হারাবে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে সাধারণ জনগণের ওপর।
আজ বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে হয় এই আলোচনা। বৈঠকে লিখিত বক্তব্য দেয় ১৩-দলীয় জোট।
জানানো হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, যা হুমকির মুখে ফেলেছে দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব। এই চুক্তির মাধ্যমে একতরফা সুবিধা ও কর্তৃত্ব নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে শুল্ক ও শুল্ক-বহির্ভূত নানা অসম শর্ত।
জোটের নেতারা অভিযোগ করেন, নন ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট বা গোপনীয়তার নীতি মেনে হওয়া এই চুক্তি দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিংবা বর্তমান নির্বাচিত সরকার কেউই প্রকাশ করেনি। তবে মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে ২৮ পৃষ্ঠার একটি নথি।
সভায় আমন্ত্রিত অতিথি ড. মোস্তাফিজুর রহমান মন্তব্য করেন, ‘চুক্তিটি কার্যকর হলে বাংলাদেশ যে বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হবে, সেটি ওই ২৮ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট থেকেই স্পষ্ট। ভয়াবহ ব্যাপার হলো, বিদেশি গণমাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে মূল চুক্তিপত্রটি আসলে ১৭৭ পৃষ্ঠার, যার অর্থ অবশিষ্ট ১৪৯ পৃষ্ঠায় কী ধরনের ভয়ংকর শর্ত লেখা আছে ,তা এখনো সবার অজানা।’
আলোচনায় তুলে ধরা হয় চুক্তির বিভিন্ন ক্ষতিকর দিক। শর্তানুযায়ী বাংলাদেশকে আগামী ১৫ বছরে কিনতে হবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি (এলএনজি), ১৫টি বোয়িং বিমান এবং প্রতিবছর সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য, যেমন গম, সয়াবিন ও গরুর মাংস। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬ হাজার ৭১০টি পণ্য বিনাশুল্কে বাংলাদেশে আমদানি করতে দিতে হবে, যা দেশের স্থানীয় শিল্পের বিকাশের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা জানালেন, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তার কোনো বিষয়ই প্রাধান্য পায়নি। তার ভাষ্য, ‘মনে হচ্ছে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে চলে যাচ্ছে দেশ। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, তাদের রুখতে হলে বাকি সব দেশকে একত্র হতে হবে। বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই বাতিল করতে হবে এই অসম বাণিজ্য চুক্তি।’
সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী এই গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বাংলাদেশ জাসদ, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলন, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাসদ (মাহবুব), গণমুক্তি ইউনিয়ন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশের সোশ্যালিস্ট পার্টি, জাতীয় গণফ্রন্ট এবং সোনার বাংলা পার্টির প্রতিনিধি ও শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থেকে অভিন্ন কণ্ঠে এই চুক্তি বাতিলের জোর দাবি জানান।




