ছায়ানট সভাপতি
বাঙালি যেন শঙ্কামুক্ত জীবনযাপন করে

যে সংগীত বাঙালির হাসি-আনন্দের সঙ্গী, কোনও অপশক্তি ভয় দেখিয়ে তাকে নিরস্ত করতে চায়- এমন মন্তব্য করেছেন ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলী। তার ভাষায়, ‘আমরা সমাজের কাছে অভয় বাণী শুনতে চাই। সংবাদকর্মীরা নির্ভয়ে প্রকৃত মত প্রকাশ করতে পারে। সকলে যেন নির্ভয়ে গাইতে পারি, যেন সংস্কৃতির সকল প্রকাশ নির্বিঘ্ন হয়, বাঙালি শংকামুক্ত জীবনযাপন করে।’
‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’- প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে রমনার বটমূলে নতুন বছরকে বরণ করেছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। মঙ্গলবার প্রথম প্রভাতে অজয় ভট্টাচার্যের কথায় ও ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের সুরারোপিত ‘জাগো আলোক-লগনে’ সম্মেলক গানের মধ্য দিয়ে সূচনা হয় অনুষ্ঠানের। পুরো অনুষ্ঠানটি সাজানো হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও লালন সাঁইয়ের গান এবং কবিতার মেলবন্ধনে।
বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলীর ভাষায়, ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালি-সংস্কৃতি তথা জাতিসত্তা উন্মোচনের এক বিশেষ দিন। বিগত প্রায় ছয় দশকের মতো এই দিনটিতে আমরা সকল গ্লানি জ্বরা মুছে ফিরে দেখি, ফেলে আসা বছরকে।’
‘গত বছরেও রমনায় নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হয়েছে নববর্ষের অনুষ্ঠান। ১৬ ডিসেম্বর উন্মুক্ত মঞ্চে হলো বিজয় দিবসের আয়োজন। তার দুদিন পরেই, গভীর রাতে, ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে ভাঙা হারমোনিয়াম-তবলা-তানপুরা এবং নালন্দার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন, শিশু-পুস্তকের দুঃসহ স্মৃতি। সেই রাতেই অগ্নিসংযোগ করা হয় দুই শীর্ষ সংবাদপত্র ভবনে। পরদিন আক্রান্ত উদীচী। এই সহিংস ঘটনাবলীর কদিন আগেই, অপদস্থ হয়েছেন বাউল শিল্পীরা। স্মরণে জেগে ওঠে, এই বটমূলে ২০০১ সালের ভয়াবহ অঘটন’— বলছিলেন সারওয়ার আলী।
যে সঙ্গীত বাঙালির আনন্দ-বেদনা-মিলন-বিরহ-সংকটের সঙ্গী, মুক্তিযুদ্ধ থেকে সকল অধিকার অর্জনের অবলম্বন, সকল ধর্ম-জাতির মানুষকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে, কোনো অপশক্তি ভয় দেখিয়ে সেই সঙ্গীত থেকে নিরস্ত করতে চায় শান্তিপ্রিয় মানুষকে। তারা আবহমান বাংলা গানকে তার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার থেকে শেকড়-বিচ্ছিন্ন করতে উদ্যত, উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছিলেন ছায়ানট সভাপতি সারওয়ার আলী।
অনুষ্ঠানে একক গানে মাকছুরা আখতার অন্তরা শোনান ‘এ কী সুগন্ধ হিল্লোল বহিল’। আজিজুর রহমান তুহিন পরিবেশন করেন ‘তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো’ এবং সেমন্তী মঞ্জরীর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘বাজাও আমারে বাজাও’। নজরুল সঙ্গীতের পর্বে বিটু কুমার শীল গেয়ে শোনান ‘অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারি’। এ ছাড়া খায়রুল আনাম শাকিল ‘স্নিগ্ধ শ্যাম কল্যাণ রূপে’ এবং শারমিন সাথী ইসলাম ময়না ‘তোমার আমার এই বিরহ’ গানটি পরিবেশন করেন।
আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দোপাধ্যায় ও খায়রুল আলম সবুজ। চন্দনা মজুমদার গেয়ে শোনান লালন সাঁইয়ের ‘বড় সংকটে পড়িয়া দয়াল’।
অনুষ্ঠানে বড় ও ছোটদের দল পৃথক এবং যৌথভাবে বেশ কিছু গান পরিবেশন করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সলিল চৌধুরীর ‘পথে এবার নামো সাথী’ ও ‘সেদিন আর কত দূরে’ এবং শিশুদের কণ্ঠে ‘ডিম পাড়ে হাঁসে’। সবশেষে উপস্থিত সকলে মিলে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে বর্ষবরণের এই আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।
















