বদলি-পদায়নে লুকোচুরি, বিশৃঙ্খল প্রশাসন
- মন্ত্রীর আপত্তিতে যোগ দিতে পারেননি নতুন বাণিজ্য সচিব বদলির পরও রুটিন দায়িত্বে আগের সচিব
- নিয়োগ পেয়েও দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না ইডিসিএলের এমডি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জনপ্রশাসনে বদলি-পদায়নে চলছে ‘লুকোচুরি খেলা’। নিয়োগ দেওয়ার পর অনেক সময় গোপন রাখা হয় প্রজ্ঞাপন। দেওয়া হয় না ওয়েবসাইটে। আবার কাউকে বদলি করা হলেও যাচ্ছেন না নতুন কর্মস্থলে। নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন আগের ডেস্কেই। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্ট্যান্ড রিলিজ বা প্রত্যাহারের আদেশ দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রজ্ঞাপন জারির পরও কেউ কেউ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আপত্তিতে বসতে পারছেন না নতুন চেয়ারে। সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা বেড়েছে, যা প্রশাসনের জন্য এক ধরনের ‘অশনিসংকেত’ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের শঙ্কা, সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি মেনে সব কার্যক্রম পরিচালনা করা না হলে গোটা প্রশাসনের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে।
এসব বিষয় ‘বড় কিছু নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সততা, মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে প্রশাসনের নিয়োগ-পদায়ন হচ্ছে। বদলি-পদায়নের প্রতিটি প্রজ্ঞাপনও ওয়েবসাইটে দিতে হবে। টেকনিক্যাল কারণে দু-একটি নাও যেতে পারে।’
জানা গেছে, জনস্বার্থে বদলি করা হলেও প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাই তা অমান্য করছেন। কিছুতেই তারা বদলি আদেশ মানছেন না।
এ কারণে গত এক মাসে বিভিন্ন স্তরের অন্তত এক ডজন কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। অথচ সার্ভিস রুলের ৮১ ধারা অনুযায়ী, বদলি আদেশের পর নতুন কর্মস্থলে যোগদানের প্রস্তুতির জন্য একজন কর্মকর্তা সর্বোচ্চ ছয় দিন সময় পান। একই শহরে বদলি হলে প্রস্তুতির সময় পান না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৫ মে শেষ কর্মদিবস ছিল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব মো. দেলোয়ার হোসেনের। ঈদের পর প্রথম কর্মদিবসে তাকে এক বছরের জন্য একই পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। অথচ সেই চুক্তির নিয়োগের প্রজ্ঞাপনের কপি এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (শনিবার রাত সাড়ে ৮টা) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি। এর আগে ২১ মে এক প্রজ্ঞাপনে সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আ কা মো. আশরাফুজ্জামানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেই প্রজ্ঞাপন আজও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি। নিয়োগে ইডিসিএলের পরিচালনা পর্ষদের (বোর্ড) অনুমোদন না থাকায় এমডির দায়িত্ব পালনে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছে বোর্ড।
এদিকে ২৫ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আতাউর রহমান খানকে পদোন্নতি দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন সচিবের দায়িত্ব দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ঈদের ছুটির পর প্রথম কার্যদিবস সোমবার নিয়োগপ্রাপ্ত সচিব তার দপ্তরে যান এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের দপ্তরে গিয়ে যোগদানপত্র দাখিল করেন। কিন্তু তার যোগদানপত্র গৃহীত হয়নি। এর পর থেকে তিনি আগের দপ্তরে অফিস করছেন। তিনি সচিব পদে পদোন্নতি পেলেও বাধ্য হয়ে কাজ করছেন অতিরিক্ত সচিব পদে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব মাহবুবুর রহমান গত ১৭ এপ্রিল ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তারপর থেকে দেড় মাস ধরে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবদুর রহিম খান রুটিন দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি তার চাকরিজীবনের প্রায় আট বছরই কাটিয়েছেন এই মন্ত্রণালয়ে। দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে তিনি একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। এ কারণে মন্ত্রী তাকেই বাণিজ্য সচিব পদে চান। তবে বাণিজ্য সচিবের রুটিন দায়িত্ব পালনকারী এই অতিরিক্ত সচিবকে গত ১ জুন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে বদলি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু মন্ত্রীর ছাড়পত্র না পাওয়ায় তিনি এখনো বাণিজ্য সচিবের রুটিন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
এ ছাড়া ২৪ মার্চ আবদুর রশীদ মিয়াকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী পদে এক বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। নিয়োগের পাঁচ দিন পর তার নিয়োগ বাতিল করা হয়। এর এক দিন পর ২৫ মার্চ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক; বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে তাদের পদে অন্য তিনজন সচিব নিয়োগ করা হয়। পরে এক দিনের মধ্যে আগের তিন সচিবের বদলি আদেশ স্থগিত করে তাদের বহাল রাখা হয়।
বদলি পদায়ন নিয়ে আদেশ না মানা অথবা সিদ্ধান্তহীনতার বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘উচ্চতর পদগুলোতে নিয়োগ ও পদায়ন হয় সরকারপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়েই। এরপর যদি তা বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে প্রশাসনের ‘চেইন অব কমান্ড’ থাকে না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যাকে যে পদে নিয়োগ দেয়, তাকেই মেনে নিয়ে কাজ করা উচিত। এ ছাড়া নিয়োগ-পদায়নের প্রজ্ঞাপনও ওয়েবসাইটে নিয়ম অনুযায়ী দিতে হবে। নইলে মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা যেতে পারে। স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।’




