শুধু ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নির্মূল সম্ভব নয়

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
মশকনিধন কার্যক্রমের অবস্থা এবং উদ্যোগ নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র
আগামীর সময়: চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। আটটি ওয়ার্ডকে ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে সিটি করপোরেশন কী করছে?
ডা. শাহাদাত হোসেন: ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বর্ষার শুরুতে চালু হওয়া ‘মশকনিধন ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। স্বাস্থ্য দপ্তরের জরিপে চিহ্নিত আটটি হটস্পট ওয়ার্ডে ১৫৫টি প্রজননক্ষেত্র চিহ্নিত করে ওষুধ প্রয়োগ ও লার্ভা ধ্বংস করা হয়েছে। আমরা ঢালাওভাবে স্প্রে করছি না। সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে আক্রান্ত রোগীর ঠিকানা নিয়ে তার বাসস্থানের আশপাশের ৫০০ মিটার এলাকায় কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে। আগস্টে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা মোকাবিলায় ৬০ সদস্যের বিশেষ প্রশিক্ষিত দল ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে। সকালে লার্ভিসাইড (পানিতে) এবং বিকালে ফগিং (উড়ন্ত মশা) করার রুটিন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নিয়ম না মানলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আগামীর সময়: মশকনিধনে আপনাদের জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি এবং ওষুধের মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।
ডা. শাহাদাত হোসেন: প্রয়োজনের তুলনায় জনবলের কিছুটা ঘাটতি আছে। তবে বর্তমানে ৪১টি ওয়ার্ডে ১৬৫ জন নিয়মিত স্প্রেম্যান এবং বিশেষ দলের ৬০ জন কাজ করছেন। তাদের সবাইকে দুদিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। মাঠে ৭৪টি ফগার, ১৬০টির বেশি স্প্রে মেশিন ও ছয়টি পাওয়ার স্প্রে মেশিন সচল রয়েছে। ওষুধের মানের বিষয়ে কোনো আপস করছি না। প্রতি লট কীটনাশক সরকারি প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর থেকে পরীক্ষা করানো হয়। আইন অনুযায়ী কমপক্ষে ৯০ শতাংশ কার্যকারিতা থাকলেই তা ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে চার মাসের ওষুধ মজুদ রয়েছে। অ্যাডাল্টিসাইড হিসেবে ডেল্টামেথ্রিন এবং লার্ভিসাইড হিসেবে বিটিআই ও টেমিফস ৫০ ইসি ব্যবহার করা হচ্ছে।
আগামীর সময়: বিটিআই ব্যবহারে মাঠপর্যায়ে কেমন ফল পাচ্ছেন?
ডা. শাহাদাত হোসেন: লার্ভা ধ্বংসে আমরা ডব্লিউএইচও স্বীকৃত ও পরিবেশবান্ধব জৈব লার্ভিসাইড বিটিআই ব্যবহার করছি। দেশে বর্তমানে একমাত্র চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনই বৈজ্ঞানিক উপায়ে এই বিটিআই ব্যবহার করছে। মাঠপর্যায়ে এর ইতিবাচক ফলাফলও পাচ্ছি। বর্তমানে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৬২০ জন এবং মৃত্যুর হার শূন্য। ২০২৩ ও ২০২৫ সালের একই সময়ে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ছিল।
বিটিআই একটি প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া, যা মশার লার্ভার পরিপাকতন্ত্রে সুনির্দিষ্টভাবে কাজ করে। অন্য রাসায়নিক কীটনাশকের তুলনায় এটি পরিবেশবান্ধব এবং মশার প্রজনন চক্র ভাঙতে কার্যকর।
আগামীর সময়: বাসাবাড়িতে লার্ভা পেলে জরিমানার কথা বলা হলেও অভিযান চোখে পড়ে না। তদারকি কি দুর্বল?
ডা. শাহাদাত হোসেন: তদারকি বাড়াতে ছয়জন প্রশিক্ষিত মশক পরিদর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আইনি ব্যবস্থা নিতে ছয়জন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও দুজন স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ে আটটি দল গঠন করা হয়েছে। তারা নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবেন। ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপের মাধ্যমে মশা নিয়ে আসা ১০০টির বেশি অভিযোগ এরই মধ্যে সমাধান করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন সংস্থা ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গেও নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান চলছে।
আগামীর সময়: নগরবাসীর প্রতি আপনার আহ্বান কী?
ডা. শাহাদাত হোসেন: এডিস মশা মূলত বাসাবাড়িতে প্রজনন করে। তাই শুধু সিটি করপোরেশনের ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তিন দিনের বেশি বাসা, ছাদ, ফুলের টব, ডাবের খোসা বা আশপাশে স্বচ্ছ পানি জমতে দেওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সচেতনতাই এই সংকট থেকে উত্তরণের প্রধান পথ। নাগরিকদের সচেতন করতে ২১ জুলাই থেকে দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ চলছে, যা নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। নাগরিকদের সহযোগিতা ছাড়া ডেঙ্গুমুক্ত চট্টগ্রাম গড়া কঠিন।






