মবে আহতের সংখ্যা বেড়েছে ৭৭ শতাংশ
- দীর্ঘ হচ্ছে সহিংসতার শিকার মানুষের তালিকা
- আরও গভীর হচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) লোগো
দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে মব সহিংসতা। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা যেন দিন দিন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। কোথাও চোর সন্দেহে, কোথাও ছিনতাইকারী কিংবা কথিত অপরাধীর অভিযোগে, আবার কোথাও গুজব বা ভুল-বোঝাবুঝি কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ জনতার হামলায় প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। এসব ঘটনায় শুধু দুষ্কৃতকারীরাই নন, নিহত ও আহত হচ্ছেন নিরপরাধ মানুষও। ফলে বিচারবহির্ভূত শাস্তির এই সংস্কৃতি দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও মানবাধিকারের জন্য ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মব সহিংসতার শিকার হওয়া মানুষের তালিকাও দীর্ঘ হচ্ছে। পুলিশ সদস্য, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ, পথচারী, এমনকি বিদেশি নাগরিকও রেহাই পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই জনতা হামলায় নেমে পড়ছে। কোথাও বাসাবাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ আরও গভীর হচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জানিয়েছে, চলতি মাসে মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকলেও আহতের সংখ্যা বেড়েছে ৭৭ শতাংশ। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের সংখ্যা বেড়েছে ৫৭ শতাংশ এবং নিহতের সংখ্যা হয়েছে দ্বিগুণের বেশি। সংস্থাটির মতে, এ চিত্র দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ ক্রমেই আরও সহিংস এবং অনিরাপদ হয়ে ওঠার ইঙ্গিত বহন করছে। এমএসএফের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে এসেছে, অজ্ঞাত ও নামীয় মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা বেড়েছে ২২ শতাংশ। সংস্থাটির ভাষ্য, এটি শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিই নয়, অপরাধ তদন্তের দুর্বলতা এবং নাগরিক নিরাপত্তাহীনতারও স্পষ্ট প্রতিফলন।
উদ্বেগ রয়েছে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও। কিছু এলাকায় সীমান্তে নিহতের সংখ্যা কমলেও পুশইনের চেষ্টা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা সম্ভাব্য মানবিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাশাপাশি আরাকান আর্মির অপহরণ তৎপরতা বৃদ্ধি এবং সীমান্তে সহিংসতার ঘটনাগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সব মিলিয়ে এমএসএফের মূল্যায়ন, জুন মাসে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে বহুমাত্রিকভাবে। রাজনৈতিক সহিংসতা, মব, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সীমান্ত সংকট একসঙ্গে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। সংস্থাটি মনে করে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অপরাধীদের কার্যকর জবাবদিহির আওতায় আনা, নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এমএসএফের জুন মাসের এক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জুন মাসে অন্তত ৭৮টি মবের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ৩৩ জন নিহত ও ১২৬ জন গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। যেখানে গত মে মাসে নিহত ৩২ ও আহত হয়েছেন ৭১ জন।
রাজনৈতিক সহিংসতা
জুন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট ৭ জন মারা গেছেন। যাদের মধ্যে আন্তঃকলহে বিএনপির ৩ জন, বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ময়মনসিংহে বিএনপির একজন নিহত হন। এ ছাড়াও বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে যশোরে একজন, নাটোরে একজন এবং গাইবান্ধায় বিএনপি-শিবির সংঘর্ষে এক শিবিরকর্মী নিহত হয়েছেন। গত মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছিলেন ৩ জন।
এ ছাড়া এ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয়েছেন ৩০৩ জন। যাদের মধ্যে বিএনপির ২০৩ জন, আওয়ামী লীগের ৩৩ জন, জামায়াতের ৫২ জন আর ১৫ জন এনসিপির, যা গত মে মাসে ছিল ১৯৩। এ মাসে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হয়েছেন ৭ জন। এর মধ্যে ৫ জন বিএনপির। পাঁচজনের ৩ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়; বাকি ২ জনকে হত্যা করা হয় ছুরিকাঘাতে।
অজ্ঞাতনামা ও নামীয় মরদহে উদ্ধার
এ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ২ কিশোর, ১২ নারী ও ৪৭ পুরুষ এবং ১ জনের বয়স ও লিঙ্গ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। এই মোট ৬৫টি নামীয় ও অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে। গত মাসে এর সংখ্যা ছিল ৫৩ জন। এসব অজ্ঞাতনামা লাশের বেশিরভাগই নদী বা ডোবায় ভাসমান, মহাসড়ক বা সড়কের পাশে, সেতুর নিচে, রেললাইনের পাশে, ফসলিজমিতে ও পরিত্যক্ত স্থানে পাওয়া যায়। অল্পসংখ্যক মৃতদেহ গলা কাটা, বস্তাবন্দি, হাত-পা বাঁধা ও রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি
জুন মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে ২ বাংলাদেশি নিহত ও ২ বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় বাংলাদেশি বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অপরদিকে, মিয়ানমার সীমান্তে ৩ দফায় ৩টি স্থল মাইন বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলে ৩ বাংলাদেশি নিহত হয়।
এ ছাড়াও মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির গুলিতে এক রোহিঙ্গা যুবক আহত হয়। পাশাপাশি ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় ৭ বাংলাদেশিকে পুশইন করা হয় এবং ৪২৩ জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। যার ফলে সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের জীবনযাপন করছেন বলে দাবি মানবাধিকার সংগঠনটির।
সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মাজারে হামলা
এ মাসে বগুড়া, সুনামগঞ্জ, ফরিদপর ও ময়মনসিংহে প্রতিমা ভাঙচুরের ৫টি ঘটনা ঘটেছে। তা ছাড়া সুনামগঞ্জে এক সংখ্যালঘুর ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং কক্সবাজারের জুমপাড়ায় পরিচয়বিহীন একদল লোক হামলা করে, গুলি ছোড়ে ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে। চাঁদপুরে এক নারী পীরের আস্তানায় মসজিদের ইমামের নেতৃত্বে হামলা করা হয়। উপস্থিত নারীরা প্রতিহত করে এবং উভয়পক্ষে ১০ জন আহত হয়।




