চালু হচ্ছে সামাজিক বীমা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে দেশে চালু আছে বেশ কয়েক ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। এবার সেখানে আসছে কিছু পরিবর্তন। দারিদ্র্য নিরসন, বৈষম্য কমানোসহ সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে কিছুটা স্বস্তি দিতে আনা হচ্ছে এই ভিন্নতা। শুরুতেই চলমান ৯০ কর্মসূচি থেকে কমিয়ে আনা হবে ৩০টিতে। ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডের বাইরে সামাজিক বীমাসহ নতুন ১৪টি কার্যক্রম যুক্ত হবে সামাজিক নিরাপত্তায়। তৈরি হবে নেক্সট জেনারেশন সোশ্যাল প্রটেকশন পলিসি। বর্তমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনায় চিহ্নিত হয়েছে ৩১টি চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরে এ খাতে বাজেট বরাদ্দ ২ দশমিক ১১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে আগামী চার অর্থবছর জিডিপির ৩ শতাংশ করে বরাদ্দ উন্নীত করা হবে। সরকারের পঞ্চবার্ষিক স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে তুলে ধরা হয়েছে এসব তথ্য। চলতি অর্থবছর শুরু হয়ে আগামী ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে এসব লক্ষ্যপূরণের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
ফ্রেমওয়ার্কটি তৈরির দায়িত্বে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো উৎপাদনমুখী করা হবে। কেননা যেসব কর্মসূচিতে সরকার বিনিয়োগ করবে, সেগুলো যাতে ফলাফল বেইজ হয়, সেই প্রচেষ্টা থাকবে।’
দেশে এরই মধ্যে একটি বৃহৎ সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে উল্লেখ করে মঞ্জুর হোসেন বললেন, ‘দারিদ্র্য ও ঝুঁকিপূর্ণতার ওপর যথেষ্ট জোরালো মনোযোগের অভাবে বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধকতা, শিক্ষার্থীর মতো শ্রেণিভিত্তিক বা কর্মসূচি, নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ডের কারণে এর কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়েছ। অনেক কর্মসূচিই দারিদ্র্য ও ঝুঁকিপূর্ণতাকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হলেও, সাম্প্রতিক বিশ্লেষণধর্মী কাজ এই কাঠামোগত ঘাটতিকে তুলে ধরেছে।’
ফ্রেমওয়ার্ক পর্যালোচনা করে দেখা গেল, নতুন কর্মসূচির মধ্যে থাকবে ‘কর্মক্ষেত্রে আঘাত’ প্রকল্প। এটির জন্য আইন তৈরির মাধ্যমে পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে একটি বিধিবদ্ধ জাতীয় ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হবে। এ ছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, গ্রামীণ নিরক্ষর, গৃহিণী, প্রবীণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বেকারদের জন্য হাঁস ও মুরগি পালন, পশুপালন, হস্তশিল্প, কুটিরশিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কম্পিউটার ও ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণসহ স্বল্পমূল্যের ক্ষুদ্রঋণ, সরঞ্জাম সহায়তাসহ লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু করা হবে।
অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিকে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর আওতায় রিকশাচালক, দিনমজুর, হকার, ফুটপাতের বিক্রেতা, পরিবহনকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, হরিজন জনগোষ্ঠী এবং অসংগঠিত ও বেসরকারি খাতে কর্মরত সবার জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি দৈনিক কাজে যুক্তদের সুযোগ সম্প্রসারণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। সামাজিক বীমার আওতায় বেকারত্ব, মাতৃত্ব ও অসুস্থতা বীমার জন্য আইনি এবং বীমাসংক্রান্ত ভিত্তি তৈরি করা হবে। পাশাপাশি জাতীয় শ্রমিক ডেটাবেজও তৈরি করা হবে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে সামাজিক নিরাপত্তা ইউনিট তৈরির জন্য আইন প্রণয়ন করা হবে। বাজেট যৌক্তিকীকরণ করা হবে। এক্ষেত্রে সাধারণ ব্যয়, ভর্তুকি এবং অবকাঠামোর মতো ব্যয় থেকে প্রকৃত সামাজিক সুরক্ষাকে আলাদা করা হবে। মানবিক সহায়তায় দুর্যোগে ত্রাণ, জরুরি খাদ্য ও নগদ সহায়তাকে একটি একক মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় একীভূত করা হবে। অভিবাসন চক্র জুড়ে অভিবাসী শ্রমিক সুরক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন করে প্রস্থান-পূর্ববর্তী আর্থিক সহায়তা, কর্মকালীন কনস্যুলার সহায়তা এবং প্রত্যাবর্তনের পর পুনঃএকত্রীকরণকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে। জুলাই যোদ্ধারাও আসবে সামাজিক কর্মসূচির আওতায়। একটি সংস্কার ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্যতা, মূল্যায়ন ব্যবহার করা এবং তা প্রচার করা হবে। একটি সামাজিক রেজিস্ট্রি ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলো হলো— সঠিক সুবিধাভোগী নির্বাচন, ভর্তুকি ও অবকাঠামো ব্যয় যোগ করে অতিরঞ্জিত বরাদ্দ দেখানো, প্রকৃত ব্যয় জিডিপির শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ, ৯০টির মতো কর্মসূচি ছড়িয়ে থাকায় অর্থবহ প্রভাব কম, বাস্তবতার ভিত্তিতে বরাদ্দ নির্ধারণ না করা, পারিবারিক দারিদ্র্য কমানোর পরিবর্তে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কার্যক্রম এবং দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব।






